১. ভূমিকা
বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় ছোটগল্পের বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কিছু লেখক কেবল কাহিনীকার হিসেবে নন, বরং সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্বের দক্ষ ‘প্যাথলজিস্ট’ বা শল্যবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ছোটগল্পাকার গি দ্য মোপাসাঁ (১৮৫০-১৮৯৩) এবং বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কথাশিল্পী বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯) এই ধারার সার্থক প্রতিনিধি। মোপাসাঁ ছিলেন ফরাসি ন্যাচারালিজমের প্রধান রূপকারদের একজন, যিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও মানুষের জৈবিক তাড়নাকে কোনো কৃত্রিম প্রলেপ ছাড়াই তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, বনফুল পেশায় চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে মানুষের শরীর ও মনের গভীর অসুখগুলোকে এক অদ্ভূত নিরাসক্তির সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই দুই লেখকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, তাঁদের জীবনদৃষ্টিতে এক গভীর সাযুজ্য বিদ্যমান, যা বর্তমান গবেষণার মূল অন্বিষ্ট।
বনফুলের ‘বুধনী’ এবং মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়া জেল ফিফি’ উভয় গল্পই মানুষের আদিম প্রবৃত্তির (Primal Instincts) এক মর্মান্তিক দলিল। এই গল্প দুটির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সভ্যতার যে পাতলা আবরণ আমরা সযত্নে রক্ষা করি, সংকটের মুহূর্তে তা কীভাবে ছিঁড়ে পড়ে এবং অন্তরালের ‘আদিম পশু’ বা ‘The Human Beast’ বেরিয়ে আসে। বনফুলের শিল্পশৈলী মূলত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সংকেতময়; তিনি অল্প কথায় মানুষের মনের গহীনে থাকা অন্ধকার গলিগুলোকে উন্মোচন করেন। বিপরীতে মোপাসাঁ অনেক বেশি বর্ণনামূলক এবং তাঁর আখ্যান বিন্যাস অত্যন্ত নাটকীয়। কিন্তু উভয় লেখকেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁদের ‘ক্লিনিক্যাল ডিটাচমেন্ট’ বা চিকিৎসকোচিত নিরাসক্তি। তাঁরা যখন একটি চরিত্রের পতন বা স্খলন বর্ণনা করেন, তখন তাঁরা বিচারকের আসনে বসেন না, বরং একজন নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষকের মতো ঘটনার কার্যকারণ বিশ্লেষণ করেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘দেহ-রাজনীতি’ (Body Politics) এবং লিঙ্গীয় আধিপত্যের আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বনফুলের বিল্টু এবং মোপাসাঁ-র উইলহেম (ফিফি) উভয়ই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের দুই উগ্র প্রতীক। বিল্টু যেখানে অরণ্যের আদিমতায় বুধনীকে নিজের একান্ত সম্পদ বা স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে দেখে, উইলহেম সেখানে যুদ্ধের জয়ী উন্মাদনায় ফরাসি নারীদের দেহকে নিজের বিজয়স্তম্ভ হিসেবে কল্পনা করে। উভয়ের মনস্তত্ত্বেই নারীর শরীর কেবল একটি বস্তু হিসেবে পর্যবসিত হয়। ফ্রয়েডীয় দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিল্টুর প্রেম বিবর্তিত হয়ে ধ্বংসাত্মক ‘থানাটোস’ বা মৃত্যু প্রবৃত্তিতে রূপ নেয়, যেখানে সে তার নিজের সন্তানকেও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। অন্যদিকে মোপাসাঁ-র গল্পে রাচেলের মাধ্যমে প্রান্তিক নারীর যে প্রতিবাদী রূপ ফুটে ওঠে, তা বনফুলের বুধনীর নীরবতার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এই গবেষণাপত্রটির উদ্দেশ্য হলো, জেন্ডার পলিটিক্স এবং মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে এই দুই ভিন্ন মেরুর গল্পের একটি সমন্বিত তুলনামূলক পাঠ উপস্থাপন করা। বনফুলের আদিবাসী জীবনের পটভূমি এবং মোপাসাঁ-র যুদ্ধের আবহে কীভাবে মানুষের আদিম জৈবিক সত্তা অভিন্নভাবে কাজ করে, তা-ই এখানে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই তুলনামূলক আলোচনাটি কেবল দুটি গল্পের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য দেখাবে না, বরং তা বিশ্বসাহিত্যের চিরন্তন মানবিক সংকট, পুরুষের মালিকানাবোধ এবং নারীর অস্তিত্বের লড়াইকে নতুন আঙ্গিকে উন্মোচন করবে।
১.২ গবেষণার যৌক্তিকতা
সাধারণত বনফুলের গল্পের আলোচনা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, ছোটগল্পের আঙ্গিকগত অভিনবত্ব কিংবা তাঁর অণু-গল্পের চমকপ্রদ সমাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। একইভাবে মোপাসাঁ-র আলোচনা মূলত ফরাসি বাস্তববাদ, যুদ্ধের ভয়াবহতা কিংবা ফরাসি সমাজের অবক্ষয়ের চিত্রায়নে নিবদ্ধ থাকে। কিন্তু এই গবেষণার মূল যৌক্তিকতা নিহিত রয়েছে ‘দেহ-রাজনীতি’ (Body-Politics) বা নারীর দেহের ওপর পুরুষের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে। ভিন্ন দুই সংস্কৃতির—উগ্র ফরাসি আভিজাত্য বনাম অরণ্যচারী ভারতীয় আদিমতা—প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের যে অভিন্ন প্যাটার্ন বা ছাঁচ এখানে কাজ করে, তা আগে কোনো গবেষণায় পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয়নি।
বনফুলের ‘বুধনী’ এবং মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়া জেল ফিফি’ উভয় গল্পই প্রমাণ করে যে, সভ্যতার যে কৃত্রিম প্রলেপ আমরা রক্ষা করি, তা অত্যন্ত ভঙ্গুর। যখনই পরিবেশ প্রতিকূল হয় বা ব্যক্তিগত অধিকারবোধে আঘাত লাগে, তখনই মানুষের অন্তরালের ‘আদিম পশু’ বা ‘দ্য হিউম্যান বিস্ট’ (The Human Beast) তার পাশবিক রূপ নিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে। এই তুলনামূলক পাঠটি কেবল দুটি গল্পের শৈল্পিক তুলনা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক লিঙ্গীয় সংকটের একটি চিরন্তন চিত্র তুলে ধরবে যা আজও সমকালীন সমাজবাস্তবতায় এবং ‘মি টু’ (Me Too) মুভমেন্টের পরবর্তী জমানায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ভিন্ন ভিন্ন দেশ-কাল-পাত্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে এই গবেষণাটি প্রমাণ করবে যে, নারীর শরীর কীভাবে ক্ষমতার লড়াইয়ে এক একটি ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়।
১.৩ ‘ক্লিনিক্যাল ডিটাচমেন্ট’ (Clinical Detachment) বা শল্যবিদের নির্লিপ্ততা
বনফুল ও মোপাসাঁ-র সাহিত্যিক সার্থকতা তাঁদের গভীর ইমোশন বা ভাবাবেগের মধ্যে নয়, বরং তাঁদের তীক্ষ্ণ ‘ক্লিনিক্যাল ডিটাচমেন্ট’ বা চিকিৎসকোচিত নিরাসক্তির মধ্যে নিহিত। একজন শল্যবিদ যেমন রোগীর শরীরের পচনশীল অংশ বা ক্ষত কাটার সময় ব্যক্তিগত আবেগের বশবর্তী হন না, বরং নির্লিপ্তভাবে রোগের উৎস ও ধরণ শনাক্ত করতে সচেষ্ট হন, এই দুই লেখকও তাঁদের সাহিত্যে সেই একই বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করেছেন। বনফুল পেশায় একজন চিকিৎসক হওয়ায় মানুষের শরীরতত্ত্ব, জৈবিক তাড়না, যৌন বিকৃতি কিংবা অন্ধ হিংস্রতাকে দেখেছেন এক ধরণের প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট বা ডায়াগনস্টিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
মোপাসাঁ-র ক্ষেত্রেও তাঁর জীবনদর্শন ছিল এক ধরণের ‘সার্জিক্যাল প্রিসিশন’ (Surgical Precision)। তিনি ফরাসি ন্যাচারালিজমের সেই ধারার অনুসারী ছিলেন যেখানে লেখককে মনে করা হয় একজন ‘এক্সপেরিমেন্টার’ বা পরীক্ষক। বনফুল ও মোপাসাঁ—উভয়ই কোনো চরিত্রকে প্রথাগত নৈতিকতার মানদণ্ডে ‘ভালো’ বা ‘মন্দের’ কাঠগড়ায় দাঁড় করান না। তাঁরা বিচারের পরিবর্তে পর্যবেক্ষণে বিশ্বাসী। বিল্টু কেন খুনি হয়ে ওঠে কিংবা ফিফি কেন পৈশাচিক লালসায় মেতে ওঠে—তাঁরা তা বর্ণনা করেন একজন ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানের মতো। এই নিরাসক্তিই তাঁদের গল্পকে নিষ্ঠুরভাবে সত্য করে তোলে এবং পাঠককে এক অস্বস্তিকর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই গবেষণায় আমরা দেখব কীভাবে এই ‘ক্লিনিক্যাল’ দৃষ্টিই তাঁদের লেখাকে জেন্ডার এবং পলিটিক্সের এক অভিন্ন পাঠে পরিণত করেছে।
২. গবেষণার রূপরেখা
যেকোনো তুলনামূলক সাহিত্যিক গবেষণার সার্থকতা নির্ভর করে তার সুশৃঙ্খল পদ্ধতির ওপর। বর্তমান গবেষণাপত্রটি বনফুল ও মোপাসাঁ-র ছোটগল্পের জগতকে কেবল শিল্পতাত্ত্বিক নিরিখে নয়, বরং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও লিঙ্গীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ব্যবচ্ছেদ করতে সচেষ্ট হয়েছে।
২.১ গবেষণা প্রশ্ন
এই গবেষণাপত্রটি মূলত নিম্নোক্ত তিনটি মৌলিক জিজ্ঞাসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে:
- ভিন্ন ভৌগোলিক সীমানা ও সমাজবাস্তবতায় রচিত হওয়া সত্ত্বেও বনফুলের ‘বুধনী’ ও মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে মানুষের আদিম প্রবৃত্তির (Primal Instincts) বহিঃপ্রকাশে কী ধরণের অভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়?
- পুরুষের ‘মালিকানাবোধ’ (Sense of Ownership) কীভাবে নারীর দেহ ও সামাজিক অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
- পিতৃতান্ত্রিক ইগোর সংঘাত এবং জাতীয়তাবাদের দম্ভ কীভাবে শেষ পর্যন্ত নারীর মাতৃত্ব কিংবা অস্তিত্বের জৈবিক সংকটকে তীব্র করে তোলে?
২.২ গবেষণা পদ্ধতি
বর্তমান গবেষণাটি একটি গুণগত বিশ্লেষণধর্মী (Qualitative Research) কাজ। এখানে প্রধানত ‘বিবরণমূলক’ (Descriptive) এবং ‘তুলনামূলক বিশ্লেষণ পদ্ধতি’ (Comparative Method) অনুসরণ করা হয়েছে। সাহিত্যের তুলনামূলক পাঠের ক্ষেত্রে ‘ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি’ বা আন্তঃবিভাগীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে সাহিত্যের সাথে মনস্তত্ত্ব (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব) এবং সমাজতত্ত্ব (দেহ-রাজনীতি ও সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ) একীভূত হয়েছে। এমিল জোলা প্রবর্তিত ন্যাচারালিজম তত্ত্বকে এখানে একটি ডায়াগনস্টিক টুল হিসেবে ব্যবহার করে চরিত্রগুলোর জৈবিক নির্ধারণবাদ (Biological Determinism) বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২.৩ তথ্যের উৎস ও উপাত্ত সংগ্রহ
গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার জন্য দুই ধরণের তথ্যের উৎস ব্যবহার করা হয়েছে:
- প্রাথমিক উৎস (Primary Sources): বনফুলের ‘বুধনী’ এবং গি দ্য মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পের মূল পাঠ (Textual Body)।
- মাধ্যমিক উৎস (Secondary Sources): সংশ্লিষ্ট লেখকদের অন্যান্য ছোটগল্প, তাঁদের জীবনদর্শন বিষয়ক প্রবন্ধ, এবং সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিকদের (যেমন—সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমিল জোলা, মিশেল ফুকো এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক) গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও গবেষণাপত্র।
২.৪ গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও পরিধি
এই গবেষণাটি মূলত বনফুল ও মোপাসাঁ-র নির্দিষ্ট দুটি গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে আলোচনার প্রয়োজনে জেন্ডার পলিটিক্স এবং ন্যাচারালিজমের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালখণ্ডকে বিচার না করে বরং মানুষের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক ছাঁচকে শনাক্ত করতে চেয়েছে।
৩. তাত্ত্বিক আলোচনা
যেকোনো সাহিত্যিক তুলনার সার্থকতা নির্ভর করে তার তাত্ত্বিক ভিত্তির গভীরতার ওপর। বনফুলের ‘বুধনী’ এবং গি দ্য মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’—উভয় গল্পই মানুষের এমন এক আদিম সত্যকে উন্মোচন করে যা কেবল সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এই গবেষণায় আমরা ন্যাচারালিজম, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক দেহ-রাজনীতির আলোকে একটি ত্রি-মাত্রিক তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করেছি।
৩.১ ন্যাচারালিজম ও ‘The Human Beast’: এমিল জোলার নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যতত্ত্ব
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এমিল জোলা (Émile Zola) সাহিত্যকে বিজ্ঞানের সমতুল্য মর্যাদায় উন্নীত করার লক্ষ্যে ‘ন্যাচারালিজম’ বা প্রকৃতিবাদের অবতারণা করেন। তাঁর দর্শনের মূলে ছিল ‘Determinism’ বা নির্ধারণবাদ, যেখানে মানুষের ভাগ্য বা আচরণ নৈতিকতার চেয়ে বংশগতি (Heredity) ও পরিবেশ (Environment) দ্বারা বেশি চালিত হয়। জোলা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘The Experimental Novel’ (১৮৮০)-এ ঘোষণা করেন “The novelist is but a recorder who is forbidden to judge and to forgive... He is a scientist, an analyst, an anatomist.” (Zola, 1880) জোলার এই ‘জৈবিক নির্ধারণবাদ’ অনুযায়ী, মানুষের ভেতরে এক আদিম বুনো সত্তা সুপ্ত থাকে। তিনি একেই বলেছেন ‘The Human Beast’ (Le Bête Humaine)। জোলার মতে, মানুষের সভ্যতার প্রলেপটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। সুযোগ পেলেই বংশগতির প্রভাবে মানুষের ভেতরের সেই পশু বেরিয়ে আসে। জোলা তাঁর সাহিত্যকর্মে মানুষের কাম, ক্রোধ ও জিঘাংসাকে অত্যন্ত নির্মোহভাবে বর্ণনা করার পক্ষপাতী ছিলেন।
মোপাসাঁ তাঁর সাহিত্যজীবনে জোলার এই ন্যাচারালিজম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো প্রায়ই তাঁদের জৈবিক প্রবৃত্তি বা সামাজিক পরিবেশের দ্বারা তাড়িত হয়। মোপাসাঁ-র শিল্পাদর্শ সম্পর্কে এমিল জোলা (১৮৯৩) তাঁর শোকবক্তৃতায় যথার্থই বলেছিলেন “He shows us a corner of nature, a part of humanity, with the absolute coldness of a scientist who dissects a corpse.” ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে প্রুশীয় অফিসার উইলহেম (যাকে সবাই ‘ফিফি’ বলে ডাকে) আভিজাত্যের মোড়কে সেই জোলার ‘Beast’-এরই এক আধুনিক সংস্করণ। তার ভেতরের হিংস্রতা কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, বরং তা ক্ষমতার দম্ভ ও জৈবিক আদিমতার এক সংমিশ্রণ। পশু। ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে ফিফি যখন বলে, “All the women in France belong to us by right” (Maupassant, 1882), তখন তা কেবল যুদ্ধের দম্ভ নয়, বরং নারীর শরীরের ওপর বিজয়ী পুরুষের আদিম অধিকারবোধকে নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, বনফুল বাংলা সাহিত্যে এই ন্যাচারালিজমকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার কারণে তাঁর কাছে মানুষ ছিল হাড়-মাংস-রক্তের এক জৈবিক আধার। বনফুলের ‘বুধনী’ গল্পে বিল্টুর চরিত্রটি অরণ্যের প্রেক্ষাপটে এক 'শিকারি'র প্রতিরূপ। বিল্টুর প্রেমের মধ্যে যে হিংস্রতা, তা কোনো পরিশীলিত আবেগ নয়, বরং তা জোলার তত্ত্বে বর্ণিত সেই আদিম প্রবৃত্তি। জোলার (১৯৮০) মতে “Man is an animal like any other, driven by his instincts and the chemicals of his blood.” বিল্টু যখন বুধনীকে অন্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনে, তখন তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা থাকে না, কারণ সে তার জৈবিক অধিকার প্রয়োগ করছে মাত্র। বনফুল ও মোপাসাঁ দুজনেই এখানে ‘Clinical Detachment’ বা শল্যবিদের নিরাসক্তি বজায় রেখেছেন। তাঁরা চরিত্রগুলোকে ঘৃণা বা করুণা করেন না, বরং তাঁদের অন্তর্গত পশুকে ল্যাবরেটরির নমুনার মতো ব্যবচ্ছেদ করেন।
৩.২ ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব: ইরোস ও থানাটোসের দ্বন্দ্ব
মনঃসমীক্ষণবাদের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ‘Beyond the Pleasure Principle’ (১৯২০) গ্রন্থে মানুষের অবচেতন মনের দুটি মূল চালিকাশক্তির কথা বলেছেন: ‘ইরোস’ (Eros) বা জীবন ও সৃজনশীল প্রবৃত্তি এবং ‘থানাটোস’ (Thanatos) বা মৃত্যু ও ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি। ফ্রয়েডের ভাষায় “The goal of all life is death... the death instinct (Thanatos) is always at work within the organism, seeking to dissolve it and to reduce life to its original condition of inorganic matter.” (Freud, 1920)
বনফুলের ‘বুধনী’ গল্পে বিল্টুর বুধনীর প্রতি যে তীব্র আকর্ষণ, তা আদতে এক উগ্র লিবিডিনাল ড্রাইভ বা ‘ইরোস’। কিন্তু এই প্রেম যখন নিরঙ্কুশ অধিকারবোধে রূপান্তরিত হয়, তখন তা ‘থানাটোস’-এ মোড় নেয়। ফ্রয়েড তাঁর ‘Civilization and Its Discontents’ (১৯৩০) গ্রন্থে বলেছেন যে, সমাজ মানুষকে সংযত করতে চায় কিন্তু মানুষের আদিম ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি সমাজের নিয়মগুলোকে অস্বীকার করতে চায়। বিল্টুর কাছে মাতৃত্ব একটি বাধা। বুধনী যখন মা হয়, তখন সে আর কেবল বিল্টুর ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ থাকে না। বিল্টু এই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে (নিজ সন্তান) সহ্য করতে পারে না কারণ তার আদিম ইগো (Id) সেখানে সম্পূর্ণ আধিপত্য দাবি করে। বনফুল অতি নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, বিল্টু শিশুটিকে হত্যা করার মাধ্যমে আসলে বুধনীর ‘মাতৃসত্তা’কেই খুন করতে চেয়েছিল। এটি থানাটোস বা মৃত্যু প্রবৃত্তির এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ, যেখানে প্রেম পর্যবসিত হয় চরম জিঘাংসায়। একইভাবে মোপাসাঁ-র গল্পে অফিসার ফিফি-র পাশবিকতা কেবল যৌন লালসা নয়, বরং তা ধ্বংসাত্মক ‘থানাটোস’। ফিফি ফরাসি নারীদের অবমাননা করার মাধ্যমে আসলে জীবনের সৃজনশীলতাকে (Eros) পদদলিত করে ধ্বংসের উল্লাস (Thanatos) করতে চায়।
৩.৩ দেহ-রাজনীতি ও সাবঅল্টার্ন সাইলেন্স: ফুকো ও স্পিভাক
আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে ‘দেহ’ কেবল মাংসপিণ্ড নয়, বরং ক্ষমতার প্রয়োগক্ষেত্র। দেহ-রাজনীতি বা Body Politics হলো সেই ক্ষমতা কাঠামো যেখানে কোনো গোষ্ঠী বা লিঙ্গ অপর গোষ্ঠীর দেহের ওপর সামাজিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তাঁর ‘The History of Sexuality’ (১৯৭৬) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতা কীভাবে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে “The body is the inscribed surface of events... power relations have an immediate hold upon it; they invest it, mark it, train it, torture it, force it to carry out tasks, to perform ceremonies, to emit signs.” (Foucault, 1976)
‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে রাচেলসহ অন্য পতিতা বা ফরাসি নারীদের দেহ হলো বিজয়ী প্রুশীয়দের ‘পলিটিক্যাল ইনস্ক্রিপশন’। ফিফি যখন রাচেলকে আঘাত করে, সে আসলে রাচেলের শরীরের ওপর দিয়ে ফ্রান্স রাষ্ট্রের পরাজয়কে চিহ্নিত করতে চায়। এখানে নারী দেহ হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র।
অন্যদিকে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri Chakravorty Spivak) তাঁর প্রবন্ধ ‘Can the Subaltern Speak?’ (১৯৮৮)-এ প্রান্তিক মানুষের নীরবতাকে এক দার্শনিক সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন “The subaltern as female cannot be heard or read... the subaltern cannot speak.” (Spivak, 1988)
বনফুলের ‘বুধনী’ চরিত্রে স্পিভাকের এই ‘Subaltern Silence’ অত্যন্ত প্রখর। বুধনী এক আদিবাসী নারী, যে লিঙ্গ ও জাতিগত উভয় দিক থেকেই প্রান্তিক। সে নির্যাতিত হয়, তার কোল খালি হয়, কিন্তু তার কোনো ‘Voice’ বা কণ্ঠস্বর আমরা শুনি না। তার কান্না অরণ্যের নিস্তব্ধতায় বিলীন হয়ে যায়। বিপরীতে, মোপাসাঁ-র রাচেল প্রান্তিক হয়েও ফিফিকে ছুরিকাঘাত করে এক ধরণের ‘Agency’ বা সক্রিয়তা প্রদর্শন করে, যা স্পিভাকের তত্ত্বের এক বৈপ্লবিক মোড়। এই দুই গল্পের তুলনামূলক পাঠে দেখা যায়, বনফুল প্রান্তিকতার ‘ট্র্যাজিক সাইলেন্স’কে তুলে ধরেছেন, আর মোপাসাঁ দেখিয়েছেন সেই নীরবতা ভাঙার সহিংস রূপ।
৪. ‘বুধনী’: অরণ্যচারী আদিমতা ও অধিকারবোধের মনস্তত্ত্ব
বনফুলের ‘বুধনী’ গল্পটি কেবল একটি অপরাধের কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং আধুনিক আইন ব্যবস্থার এক নির্মম সংঘাত। গল্পের শুরুতেই লেখক যে নিরাসক্ত বা ‘Clinical’ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের সরাসরি এক প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যায়। গল্পের নায়ক বিল্টুর ফাঁসি হবে—এ তথ্যটি লেখক কোনো আবেগ ছাড়াই দিয়েছেন “বিল্টুর জীবন-প্রদীপে তৈল পুরাই আছে... কিন্তু সে শিখা নিবিবে। একটি সবল ফুৎকারে তাহাকে নিবাইয়া দেওয়া হইবে। কাল তাহার ফাঁসি!” এই ‘ফুৎকার’ শব্দটি এখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতীক, যা একক ফুঁৎকারে একটি জৈবিক সত্তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
৪.১ প্রিডেটর বা শিকারি মনস্তত্ত্ব এবং প্রেমের আদিম রূপ
বনফুলের গল্পে বিল্টু কোনো সুসভ্য নায়ক নয়। সে অরণ্যের সন্তান। ন্যাচারালিজমের ভাষায় বলতে গেলে, তার ‘Environment’ বা পরিবেশই তার আচরণ নির্ধারণ করে দিয়েছে। মহুয়া গাছের তলায় বুধনীকে দেখা মাত্রই বিল্টুর ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া হয়, তাকে ফ্রয়েডীয় ‘লিবিডো’ বা আদিম যৌন প্রবৃত্তি বলা যেতে পারে। লেখক বলছেন “সভ্য কোন যুবক আলো-ছায়া খচিত মহুয়া তরুতলে কোন কিশোরীকে দেখিলে যে ঔদাসীন্যভরে চলিয়া যাইত, বিল্টু তাহা করে নাই। বন্য পশুর মত সে তাড়া করিয়াছিল।”
এখানে ‘বন্য পশুর মত’ শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি এমিল জোলার ‘The Human Beast’ তত্ত্বে বর্ণিত সেই সত্তা, যে কোনো সামাজিক নৈতিকতা মানে না। বিল্টুর কাছে প্রেম মানেই হলো ‘শিকার’। বুধনী তার কাছে এক ‘ত্রস্তা হরিণী’। এই যে শিকার ও শিকারির সম্পর্ক, এটাই বিল্টুর অধিকারবোধের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পরবর্তীতে বিল্টু শক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বুধনীকে জয় করে। অর্থাৎ, তার প্রেমের বৈধতা আসে পেশীশক্তি থেকে, কোনো গণতান্ত্রিক সম্মতি থেকে নয়।
৪.২ ‘Ownership’ বা একক মালিকানাস্বত্ব: দেহ-রাজনীতির আদিম পাঠ
ফুকো-র ‘Body Politics’ বা দেহ-রাজনীতি তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্ষমতা সবসময় শরীরের ওপর তার চিহ্ন রাখতে চায়। বিল্টুর ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রকাশিত হয় বুধনীকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখার মাধ্যমে। বিবাহের পর বিল্টু বুধনীকে একদণ্ডও ছাড়ে না। লেখক বর্ণনা করেছেন “অর্ধনগ্ন দেহে অবিচ্ছিন্নভাবে বিচরণ করিয়া বেড়াইত। বুধনীর খোঁপায় টকটকে লাল পলাশ ফুল, বিল্টুর হাতে বাঁশের বাঁশি—এই সম্বল।” প্রথম দেখায় এটি রোমান্টিক মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক ধরণের ‘Pathological Obsession’ বা রোগগ্রস্ত অধিকারবোধ। বিল্টুর কাছে বুধনী কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং তার শিকার করা এক দুর্লভ সম্পদ। এই মালিকানাবোধই পরবর্তী ট্র্যাজেডির বীজ বপন করে। বিল্টুর এই আচরণে ফ্রয়েডের ‘Eros’ বা জীবন প্রবৃত্তি কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু সেই ইরোস যখন সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়, তখন তা ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে।
৪.৩ মাতৃত্ব বনাম পিতৃতান্ত্রিক ইগো: ইরোস থেকে থানাটোসে রূপান্তর
গল্পের মোড় ঘোরে যখন বুধনী সন্তান প্রসব করে। ফ্রয়েডীয় দর্শনের আলোকে এটি একটি চূড়ান্ত সংঘাতের বিন্দু। বুধনীর জন্য মাতৃত্ব হলো তার নারীত্বের পূর্ণতা, তার জীবনের নতুন ‘ইরোস’। কিন্তু বিল্টুর জন্য এই শিশুটি হলো এক ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা প্রতিদ্বন্দ্বী। “বুধনী এক সন্তান প্রসব করিল। অসহায় ক্ষুদ্র এক মানবশিশু! বুধনীর সে কি আনন্দ! ...কিন্তু বিল্টুর আনন্দ হইল না।”
কেন বিল্টুর আনন্দ হলো না? এখানে বনফুল একজন দক্ষ চিকিৎসকের মতো বিল্টুর মনের জটিল গ্রন্থিটি খুলে দেখিয়েছেন। বিল্টুর ইগো (Ego) সহ্য করতে পারছে না যে, বুধনীর মনোযোগ এবং ভালোবাসার ভাগীদার অন্য কেউ হতে পারে। বুধনী এখন আর কেবল ‘বিল্টুর বউ’ নয়, সে এখন ‘শিশুর মা’। এই নতুন পরিচয়টি বিল্টুর একক আধিপত্যকে খর্ব করে।
এখানেই বিল্টুর ‘Eros’ বা সৃজনশীল প্রবৃত্তি বিবর্তিত হয়ে ‘Thanatos’ বা মৃত্যু ও ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফ্রয়েডের ‘Civilization and Its Discontents’-এ যেমন বলা হয়েছে, মানুষের আদিম ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি যখন বাইরের জগত দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন তা চরম হিংস্রতায় ফেটে পড়ে। বিল্টু শিশুটিকে ঘৃণা করতে শুরু করে, কারণ শিশুটি তার এবং বুধনীর ‘অবিচ্ছিন্ন’ সম্পর্কের মাঝে এক অনতিক্রম্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪.৪ শিশুহত্যা: একটি প্রতীকী বিনাশ
বিল্টু যখন শিশুটিকে পাথরে আছড়ে মারে, তখন সেটি কেবল একটি খুনের ঘটনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে বুধনীর ‘মাতৃসত্তা’কে ধ্বংস করার একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। “সেই কুৎসিত শিশুটা বুধনীর সমস্ত বুকটা জুড়িয়া আছে। ...বিল্টুর পিত্ত জ্বলিয়া গেল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া সে সজোরে শিশুটির পা ধরিয়া পাথরের উপর আছড়াইয়া ফেলিল।”
এই দৃশ্যটি ন্যাচারালিজমের চরম বহিঃপ্রকাশ। এখানে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো মার্জনা নেই। বিল্টুর এই কাজ জোলার সেই ‘Human Beast’-এর চূড়ান্ত রূপ, যে তার পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না। বিল্টু শিশুটিকে হত্যা করে আসলে বুধনীকে আবার সেই আদিম অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়, যেখানে সে কেবল বিল্টুর শিকার হিসেবেই থাকবে।
৪.৫ সাবঅল্টার্ন সাইলেন্স ও বুধনীর আর্তনাদ
গবেষণার এই পর্যায়ে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘Subaltern Silence’ তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পুরো গল্প জুড়ে বুধনী প্রায় বাকহীন। সে কেবল বিল্টুর লালসা ও ক্রোধের শিকার। তার কোনো নিজস্ব কণ্ঠস্বর নেই। সে আদিবাসী, সে নারী, এবং সে দরিদ্র—এই ত্রিবিধ প্রান্তিকতা তাকে এক ‘নীরব সাবঅল্টার্ন’-এ পরিণত করেছে। শিশুটি মারা যাওয়ার পর তার যে কান্না, তা কোনো ভাষা পায় না। লেখক বলছেন: “বুধনী কিন্তু কাঁদিল না। স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।”
এই স্তব্ধতা বা ‘Silence’ হলো সেই চূড়ান্ত আঘাত যা সমাজ তার ওপর হেনেছে। এমনকি যখন বিল্টুর ফাঁসি হতে চলেছে, তখনও বিল্টুর কণ্ঠস্বরই শোনা যায়— “বুধনী-বুধনী-বুধনী!” কিন্তু বুধনীর কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা জানি না। বনফুল এখানে বুধনীকে একটি ‘Object’ হিসেবেই রেখেছেন, যার ওপর দিয়ে পুরুষের ইগো এবং আইনের চাকা চলে যায়।
বিল্টুর এই চরিত্রটি বনফুলের অন্যান্য গল্পের শিকারি বা আদিম চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে ‘বুধনী’তে এই আদিমতা চরম সীমায় পৌঁছেছে। বিল্টু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও যখন বুধনীর নাম ধরে চিৎকার করে, তখন বনফুল আমাদের এক গভীর নৈতিক সংকটে ফেলেন। এটি কি তার প্রেমের আর্তি? নাকি তার অসম্পূর্ণ মালিকানাবোধের শেষ হাহাকার?
ক্লিনিক্যাল ডিটাচমেন্টের মাধ্যমে বনফুল আমাদের দেখিয়েছেন যে, বিল্টু পশুর মতো ভালোবেসেছে এবং পশুর মতোই ধ্বংস করেছে। তার অপরাধ কোনো সামাজিক শত্রুতা থেকে নয়, বরং তার রক্তের রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং আদিম প্রবৃত্তি থেকে জাত। এই ব্যবচ্ছেদই প্রমাণ করে যে, ‘বুধনী’ গল্পটি বনফুলের এমন এক সৃষ্টি যা ফরাসি ন্যাচারালিজমের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে ভারতীয় প্রান্তিক জীবনের এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচন করে।
৫. ‘মাদমোয়া জেল ফিফি’: যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও লিঙ্গীয় হিংস্রতা
গি দ্য মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পটি ১৮৭০-এর প্রুশীয়-ফরাসি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও এর মূল সুরটি মানবিক আদিমতা এবং ক্ষমতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশের। বনফুলের ‘বুধনী’ যেমন অরণ্যের আদিমতায় প্রবৃত্তির লড়াই দেখায়, মোপাসাঁ এখানে দেখিয়েছেন যুদ্ধের আবহে কীভাবে ‘সভ্যতা’ তার মুখোশ খুলে ফেলে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিজয়ী প্রুশীয় অফিসারদের দম্ভ এবং বিজিত ফরাসিদের আত্মসম্মানের লড়াই, যার মাঝখানে বলির পাঁঠা হয় নারীদেহ।
৫.১ ‘ফিফি’ এবং আভিজাত্যের অন্তরালে ‘The Human Beast’
গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র উইলহেম ফন আইরিক, যাকে তার মেয়েলি স্বভাবের জন্য ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ বলে ডাকা হয়। কিন্তু এই আপাত কোমল ডাকনামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম নৃশংস পশু। ন্যাচারালিজমের ভাষায় সে এক ‘Human Beast’। মোপাসাঁ তার বর্ণনায় বলছেন “He was a very handsome fellow, but he was also very cruel.”
ফিফি-র এই নিষ্ঠুরতা কোনো সামরিক প্রয়োজন থেকে নয়, বরং তা তার জৈবিক প্রবৃত্তি। সে শ্যাটো বা প্রাসাদের মূল্যবান আসবাবপত্র, চীনামাটির বাসন বা চিত্রকর্ম ধ্বংস করে আনন্দ পায়। এটি ফ্রয়েডীয় ‘Thanatos’ বা ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তির এক নিখুঁত উদাহরণ। মোপাসাঁ-র বর্ণনায়, ফিফি যখন একটি অতি মূল্যবান পাত্রে গানপাউডার ভরে উড়িয়ে দেয়, তখন তার চোখে যে উল্লাস দেখা যায়, তা কোনো সভ্য মানুষের নয়; তা এক আদিম ধ্বংসকামী সত্তার।
৫.২ নারীদেহ: ক্ষমতার রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র
মিশেল ফুকো-র ‘Body Politics’ বা দেহ-রাজনীতি অনুযায়ী, ক্ষমতা যখন সরাসরি কোনো ভূখণ্ড দখল করতে পারে না, তখন সে তার চিহ্ন রেখে যায় সেই ভূখণ্ডের নারীদের শরীরের ওপর। ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে অফিসাররা যখন নিকটস্থ শহর থেকে পাঁচজন পতিতা আনিয়ে ভোজসভার আয়োজন করে, তখন সেই নারীরা কেবল যৌনতৃপ্তির মাধ্যম থাকে না, তারা হয়ে ওঠে ‘বিজিত ফ্রান্স’-এর প্রতীক।
ভোজসভার দৃশ্যে ফিফি-র আচরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সে রাচেল নামক ইহুদি মেয়েটির ওপর যে নিগ্রহ চালায়, তা ব্যক্তিগত লালসার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। ফিফি যখন ঘোষণা করে “All the women in France belong to us by right, and the territory too, and all the properties.” এই সংলাপটি এই গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রতিপাদ্য। এখানে ‘Women’, ‘Territory’ এবং ‘Property’—তিনটিকে একই সমান্তরালে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরুষের মালিকানাবোধে নারীদেহ এবং স্থাবর সম্পত্তি অভিন্ন। ফিফি-র কাছে রাচেলের শরীর দখল করা মানেই হলো ফ্রান্সকে পদদলিত করা। এখানে নারীদেহ হয়ে উঠেছে এক প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্র।
৫.৩ জাতীয়তাবাদ বনাম লিঙ্গীয় হিংস্রতা: একটি মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত
গল্পের ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয় যখন ফিফি মদের নেশায় মত্ত হয়ে ফ্রান্সের পরাজয় এবং ফরাসি নারীদের নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে শুরু করে। সে বলে যে, ফ্রান্সের সমস্ত নারী এখন প্রুশীয়দের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এই চরম অবমাননা রাচেলের ভেতরে এক ঘুমিয়ে থাকা সত্তাকে জাগিয়ে তোলে।
মোপাসাঁ এখানে ফিফি-র চরিত্রের ‘Surgical Precision’ দেখিয়েছেন। ফিফি কেবল রাচেলকে ধর্ষণ করতে চায় না, সে চায় রাচেলকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করতে। সে রাচেলের মুখে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়, তাকে চড় মারে এই প্রতিটি আঘাতই আসলে ফুকোর ভাষায় ‘Disciplining the Body’। কিন্তু এই হিংস্রতার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটে, তা প্রুশীয় দম্ভের ধারণার বাইরে ছিল।
৫.৪ রাচেলের ‘এজেন্সি’ (Agency): সাবঅল্টার্ন সাইলেন্সের অবসান
বনফুলের ‘বুধনী’ যেখানে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখেও নিরব ও নিস্পন্দ থাকে (Subaltern Silence), মোপাসাঁ-র রাচেল সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত। রাচেল সমাজের চোখে একজন ‘পতিতা’ এবং জাতিতে ‘ইহুদি’—অর্থাৎ সে ডাবল মার্জিনালাইজড বা দ্বিগুণ প্রান্তিক। স্পিভাকের তত্ত্বে রাচেলের কথা বলার বা প্রতিবাদ করার কোনো অবকাশ থাকার কথা নয়। কিন্তু মোপাসাঁ রাচেলকে এক অনন্য ‘Agency’ বা সক্রিয়তা দিয়েছেন। যখন ফিফি বলে যে তারা ফ্রান্সের নারীদের দখল করেছে, রাচেল চিৎকার করে ওঠে “That is not true! You have not got the women of France!” এই প্রতিবাদটি কেবল একটি সংলাপ নয়, এটি সাবঅল্টার্ন-এর জেগে ওঠা। এরপর যখন ফিফি তাকে আক্রমণ করে, রাচেল একটি ফলের ছুরি দিয়ে ফিফিকে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞটি কেবল একজন খুনের ঘটনা নয়; এটি হলো ‘Power’ বা ক্ষমতার হাত থেকে শরীরের মুক্তি লাভের এক চরম মুহূর্ত। রাচেল জানালার কাঁচ ভেঙে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যায়—এই পলায়নটি তার ‘স্বাধীন সত্তা’র প্রতীক। বনফুলের বুধনী যেখানে তার নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, মোপাসাঁ-র রাচেল সেখানে নিজের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নেয়।
৫.৫ চার্চের ঘণ্টা: একটি নীরব কিন্তু প্রবল প্রতিবাদ
গল্পের শেষে চার্চের ঘণ্টার ভূমিকা অত্যন্ত প্রতীকী। যুদ্ধের শুরু থেকে যাজক ঘণ্টা বাজাতে অস্বীকার করেছিলেন প্রুশীয়দের সম্মানে। কিন্তু ফিফি-র মৃত্যুর পর যখন ঘণ্টাটি বেজে ওঠে, তখন তা রাচেলের সাহসিকতার জয়ধ্বনি হিসেবে অনুরণিত হয়। “The bell of the church began to ring... it rang for the death of the beast.” এখানে ‘Beast’ শব্দটি মোপাসাঁ অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। ফিফি-র মৃত্যু মানে কেবল একজন প্রুশীয় অফিসারের মৃত্যু নয়, বরং তা সেই আদিম পুরুষতান্ত্রিক পশুত্বের পরাজয় যা নারীর শরীরকে সম্পদ মনে করেছিল।
৫.৬ তুলনামূলক প্রেক্ষাপট: ‘বুধনী’ ও ‘ফিফি’র মেলবন্ধন
তুলনামূলকভাবে দেখলে দেখা যায়, বিল্টু এবং ফিফি—দুজনই ‘Ownership’ বা মালিকানাবোধে আক্রান্ত। বিল্টু তার সন্তানকে হত্যা করে কারণ সে বুধনীর শরীরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল; আর ফিফি রাচেলকে অবমাননা করে কারণ সে ফ্রান্সের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। দুজনের ক্ষেত্রেই নারীদেহ হলো একটি ‘অবজেক্ট’।
মোপাসাঁ-র অন্যান্য গল্পের (যেমন—‘বুলে দ্য সুইফ’ বা ‘Ball of Fat’) সাথে এই গল্পের সাদৃশ্য আছে যেখানে জাতীয়তাবাদ ও নারীত্বের প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে। তবে ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ অনন্য কারণ এখানে প্রান্তিক নারীটি (রাচেল) শেষ পর্যন্ত ‘সাবজেক্ট’ বা কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মোপাসাঁ এখানে কোনো নীতিবাক্য শোনাননি। তিনি একজন প্যাথলজিস্টের মতো দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ কীভাবে মানুষের মনের গহীনে থাকা পাশবিকতাকে (Thanatos) উসকে দেয়। ফিফি-র নৃশংসতা এবং রাচেলের প্রতিশোধ—উভয়ই মানবিক প্রবৃত্তির চরম সীমা। জোলার ন্যাচারালিজম অনুযায়ী, পরিস্থিতিই মানুষকে পশু বানায়, আর মোপাসাঁ সেই পশুর ব্যবচ্ছেদ করেছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। এই আলোচনা প্রমাণ করে যে, ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পটি কেবল ফরাসি দেশপ্রেমের কাহিনী নয়, এটি বৈশ্বিক দেহ-রাজনীতির এক অন্ধকার দলিল।
৬. তুলনামূলক আলোচনা: শৈলীগত ও শিল্পগত প্রকরণ
বনফুল এবং গি দ্য মোপাসাঁ—উভয়ই তাঁদের ছোটগল্পে এক ধরণের ‘Surgical Precision’ বা শল্যবিদের নিখুঁত নিরাসক্তি ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁদের এই নিরাসক্তির প্রকাশভঙ্গি এবং গল্পের গঠনশৈলীতে কিছু মৌলিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় যা পুরো গবেষণার তাত্ত্বিক ধারাকে পুষ্ট করে।
৬.১ নিরাসক্তি বনাম নৈতিকতা
ন্যাচারালিজমের প্রধান শর্ত হলো লেখকের নির্লিপ্ততা। মোপাসাঁ তাঁর 'Preface to Pierre et Jean'-এ লিখেছিলেন যে, লেখকের কাজ কেবল যা ঘটছে তা তুলে ধরা, কেন ঘটছে তার বিচার করা নয়। মোপাসাঁ ও বনফুল দুজনেই চরিত্রের প্রতি কোনো প্রথাগত সহানুভূতি বা নৈতিক বিচার দেখান না। বিল্টু যখন শিশুটিকে পাথরে আছড়ে হত্যা করে, তখন বনফুল তাকে প্রচলিত অর্থে ‘শয়তান’ বা ‘পাপী’ আখ্যা দিয়ে পাঠকের করুণা বা ঘৃণা উদ্রেক করার চেষ্টা করেন না। বরং তিনি বিল্টুর সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার একটি ‘ল্যাবরেটরি রিপোর্ট’ পেশ করেন। বনফুলের কাছে বিল্টু কোনো খুনি নয়, বরং এক জৈবিক প্রতিক্রিয়ার শিকার। মোপাসাঁ-র ক্ষেত্রেও রাচেল যখন ফিফিকে হত্যা করে, লেখক সেখানে কোনো নৈতিক রায় দেন না; বরং পরিস্থিতির অনিবার্য ফল হিসেবে ঘটনাটিকে উপস্থাপন করেন।
৬.২ পরিবেশের প্রভাব ও জৈবিক নির্ধারণবাদ
জোলার ন্যাচারালিজম অনুযায়ী পরিবেশ চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। ‘বুধনী’ গল্পে বন ও বন্যতার রুক্ষ পরিবেশ বিল্টুর চরিত্রকে গঠন করেছে। সেখানে কোনো নাগরিক আইন বা আদালত নেই, আছে কেবল পেশীশক্তি ও টিকে থাকার আদিম লড়াই। বিল্টুর ‘বন্য পশুর মতো’ তাড়া করা সেই অরণ্য-পরিবেশেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে, ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে যুদ্ধের উন্মাদনা এবং বিজয়ী শক্তির দম্ভ ফিফি-র চরিত্রকে আরও বিকৃত ও নৃশংস করে তুলেছে। অর্থাৎ, বিল্টুর ক্ষেত্রে অরণ্য এবং ফিফি-র ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্র—এই দুই পরিবেশ চরিত্র দুটির ভেতরের সুপ্ত ‘Beast’-কে জাগিয়ে তুলেছে। দুই লেখকই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মানুষ তার সামাজিক বা ভৌগোলিক পরিস্থিতির দাস।
৬.৩ মালিকানাস্বত্ব ও বস্তুকরণ
গবেষণার তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, উভয় গল্পেই নারীর ‘বস্তুকরণ’ (Objectification) অত্যন্ত প্রকট। বিল্টুর কাছে বুধনী কোনো স্বাধীন মানুষ নয়, বরং তার শিকার করা ‘প্রপার্টি’ বা সম্পদ। একইভাবে ফিফি-র কাছে রাচেল তার ‘যুদ্ধজয়ের ট্রফি’। দুই ক্ষেত্রেই নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং পুরুষের ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখা হয়েছে। পুরুষের এই ‘পজেসিভনেস’ বা মালিকানাবোধ যখনই তৃতীয় কোনো পক্ষ (বিল্টুর ক্ষেত্রে শিশুটি এবং ফিফি-র ক্ষেত্রে রাচেলের জাতীয়তাবাদ) দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই তা প্রাণঘাতী রূপ নেয়। তবে পার্থক্য হলো—বনফুলের ব্যবচ্ছেদ যেখানে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ের ‘Psychological Obsession’, মোপাসাঁ সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পর্যায়ে ‘Power Dynamics’-এ নিয়ে গেছেন।
৬.৪ বর্ণনার পরিমিতি বনাম চিত্ররূপময়তা: সংকেত ও নকশার দ্বন্দ্ব
বনফুলের শৈলী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং ইঙ্গিতবাহী। ‘বুধনী’ গল্পে তিনি দীর্ঘ বর্ণনার চেয়ে নাটকীয় মুহূর্তের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। বিল্টুর জবানবন্দি বা তার মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বনফুল কোনো অলঙ্কার ব্যবহার করেননি। এখানে জোলার ন্যাচারালিজম এক বিশেষ ভারতীয় সংকেতময়তায় (Suggestiveness) রূপান্তরিত হয়েছে। লেখক নিজে একজন ড্রইংরুম বিহারী হয়েও বুনো বিল্টুর প্রণয়লীলা কল্পনা করার দুঃসাহস দেখাননি, যা বর্ণনার চেয়ে অনুপস্থিতির মাধ্যমেই আদিমতাকে প্রখর করে তোলে।
অন্যদিকে, মোপাসাঁ-র বর্ণনা অনেক বেশি চিত্ররূপময় এবং বিস্তারিত। ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্পে শ্যাটোর পরিবেশ, বৃষ্টির শব্দ এবং ভোজসভার প্রতিটি খুঁটিনাটি বর্ণনার মাধ্যমে তিনি একটি গুমোট ও শ্বাসরুদ্ধকর আবহ তৈরি করেছেন। বনফুল যেখানে ‘সাজেশন’ বা সংকেতের মাধ্যমে পাঠককে ভাবিয়ে তোলেন, মোপাসাঁ সেখানে ‘ডিজাইন’ বা সুপরিকল্পিত বর্ণনার মাধ্যমে বাস্তবতাকে এক ধরণের গ্রাফিক রিয়ালিজমে উন্নীত করেন।
৬.৫ প্যাথলজিক্যাল ভিউ: ডায়াগনস্টিক দৃষ্টিভঙ্গির অভিন্নতা
উভয় লেখকই সমাজকে দেখেন একজন প্যাথলজিস্টের চোখে। বনফুল চিকিৎসক ছিলেন বলে তাঁর লেখায় মানুষের হাড়-মাংস-রক্তের রসায়ন খুব প্রকট। বিল্টুর শিশুহত্যার পেছনে তিনি কোনো আধ্যাত্মিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা না দিয়ে সরাসরি ‘পিত্ত জ্বলিয়া গেল’ জাতীয় জৈবিক বিক্রিয়ার কথা বলেছেন। এই ‘Chemical reaction of the blood’ সরাসরি এমিল জোলার দর্শনের প্রতিধ্বনি। মোপাসাঁ-র ক্ষেত্রেও এই নৈর্ব্যক্তিকতা বিদ্যমান। তিনি ফিফি-র চরিত্রটিকে ঘৃণ্য হিসেবে তুলে ধরলেও তাকে কোনো প্রথাগত ‘ভিলেন’ হিসেবে চিত্রিত করেননি, বরং তাকে যুদ্ধকালীন পরিবেশের এক অনিবার্য উপজাত (By-product) হিসেবে ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। উভয় লেখকই প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে মানুষের চরিত্র আসলে তার জিনতত্ত্ব ও পারিপার্শ্বিকতার এক জটিল সমীকরণ।
৬.৬ পরিণতি ও ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু: অভ্যন্তরীণ হাহাকার বনাম বহির্মুখী সক্রিয়তা
গল্প দুটির ট্র্যাজেডির ধরণ তুলনামূলক আলোচনায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ‘বুধনী’র ট্র্যাজেডি মূলত অভ্যন্তরীণ ও মনস্তাত্ত্বিক। বিল্টুর ফাঁসি হওয়া সত্ত্বেও গল্পের শেষে তার যে হাহাকার— ‘বুধনী-বুধনী!”, তা এক অমীমাংসিত রহস্য এবং গভীর মালিকানাবোধের শেষ হাহাকার হিসেবে থেকে যায়। এখানে ট্র্যাজেডি ঘটে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং আধুনিক আইনের সংঘর্ষে।
বিপরীতে, ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’-র পরিণতি অনেক বেশি বাহ্যিক এবং বৈপ্লবিক। রাচেলের মাধ্যমে মোপাসাঁ একটি রাজনৈতিক জয় ঘোষণা করেছেন। বনফুলের গল্পে পরাজয়টি ব্যক্তিমানুষের আদিমতার কাছে, যেখানে মাতৃত্বের বলিদান ঘটে। আর মোপাসাঁ-র গল্পে পরাজয়টি দম্ভ ও আধিপত্যবাদের, যেখানে নারী শেষ পর্যন্ত তার ‘এজেন্সি’ বা সক্রিয়তা ফিরে পায়। বনফুলের শিল্পকৌশল যেখানে পাঠকে এক ধরণের শূন্যতায় (Void) নিক্ষেপ করে, মোপাসাঁ সেখানে ঘণ্টার শব্দের মাধ্যমে এক ধরণের ক্যাথারসিস (Catharsis) তৈরি করেন।
৭. সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব: নারীবাদী ডিসকোর্স ও প্রান্তিকতা
বনফুল ও মোপাসাঁ-র এই ধ্রুপদী পাঠগুলো কেবল পাঠ্যপুস্তকের আলোচনা নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং লিঙ্গীয় সহিংসতার নিরিখে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁদের ডায়াগনস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমকালীন ‘দেহ-রাজনীতি’ বা ‘Body-Politics’ বোঝার জন্য এক অপরিহার্য টুলস প্রদান করে।
৭.১ সাবঅল্টার্ন সাইলেন্স ও প্রান্তিকতার সংকট
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক-এর ‘সাবঅল্টার্ন’ তত্ত্বে বুধনী এক চিরকালীন নীরবতার প্রতিনিধি। বর্তমান সময়েও প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দলিত নারীরা যখন বৃহত্তর ক্ষমতার অধীনে নির্যাতিত হন, তাঁদের কণ্ঠস্বর আজও অরণ্যের রোদনের মতো রাষ্ট্রীয় বা আইনি কাঠামোর বাইরে থেকে যায়। বুধনীর এই নীরবতা আসলে ‘স্ট্রাকচারাল সাইলেন্স’—যেখানে সমাজ তাকে কথা বলার ভাষাই দেয়নি। আজকের প্রেক্ষাপটে বনফুলের এই গল্পের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আইন কেবল দণ্ড দিতে পারে (যেমন বিল্টুর ফাঁসি), কিন্তু প্রান্তিক নারীর নীরব হাহাকার বা তাঁর মাতৃত্বের অধিকার রক্ষার কোনো কার্যকর পরিকাঠামো আজও গড়ে ওঠেনি।
৭.২ এজেন্সির জাগরণ: রাচেল বনাম আধুনিক নারী আন্দোলন
বিপরীতে মোপাসাঁ-র রাচেল চরিত্রটি ‘এজেন্সি’ বা সক্রিয় প্রতিরোধের প্রতীক। বর্তমানের ‘Me Too’ আন্দোলন বা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় নারীর সশস্ত্র প্রতিরোধের যে চিত্র আমরা দেখি (যেমন কুর্দিশ নারী যোদ্ধারা), রাচেল তার এক সার্থক পূর্বাভাস। মোপাসাঁ দেখিয়েছেন যে, একজন যৌনকর্মী বা পতিতা—যাকে সমাজ সবচেয়ে নীচ স্তরে স্থান দেয়—সে-ও যখন জাতীয় বা ব্যক্তিগত মর্যাদাহানির শিকার হয়, তখন সে হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসাত্মক। এটি আধুনিক নারীবাদী ডিসকোর্সের সেই ধারণাকে সমর্থন করে যে, নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন তা কোনো নৈতিক বা আইনি বাধার তোয়াক্কা করে না।
৭.৩ টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি ও মালিকানাবোধের আধুনিক রূপ
বিল্টুর চরিত্রটি আধুনিক ‘Toxic Masculinity’-র এক আদিম প্রতিরূপ। বর্তমান সময়েও আমরা দেখি, প্রেম বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষের ‘Obsessive Possession’ বা অন্ধ অধিকারবোধ যখন প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন তা অ্যাসিড আক্রমণ কিংবা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রূপ নেয়। বনফুলের বিল্টু প্রমাণ করে যে, সভ্যতা এগিয়ে গেলেও পুরুষের অবচেতন মনের ‘মালিকানাসত্ব’ আজও অপরিবর্তিত। মোপাসাঁ-র ফিফি চরিত্রটি আবার রাষ্ট্রীয় ও সামরিক আধিপত্যের পৈশাচিক রূপ তুলে ধরে। বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে (যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন বা গাজা সংকট) বিজয়ী পক্ষ যখন বিজিত অঞ্চলের নারীদের ওপর যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ফিফি-র সেই বিকারগ্রস্ত দম্ভই পুনরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
৭.৪ ডায়াগনস্টিক লিটারেচার ও সামাজিক সচেতনতা
উভয় গল্পের এই প্যাথলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, অপরাধীকে কেবল ঘৃণা বা শাস্তি দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। বনফুল ও মোপাসাঁ যেভাবে অপরাধের ‘রুট কজ’ বা মূল উৎসগুলো (যেমন—জৈবিক তাড়না, পরিবেশের চাপ, মালিকানাবোধ) ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা আজকের অপরাধবিজ্ঞান বা ক্রিমিনোলজির পাঠেও গুরুত্বপূর্ণ। এই সাহিত্যিক ব্যবচ্ছেদ আমাদের বাধ্য করে আয়নার সামনে দাঁড়াতে এবং স্বীকার করতে যে, সভ্যতার প্রলেপের নিচে ‘The Human Beast’ আজও ওত পেতে আছে।
৮. উপসংহার
বনফুলের ‘বুধনী’ এবং মোপাসাঁ-র ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’ গল্প দুটির একটি নিবিড় তুলনামূলক পর্যালোচনার শেষে এটি সুস্পষ্ট হয় যে, মানুষের আদিম প্রবৃত্তি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা কালখণ্ডের জালে সীমাবদ্ধ নয়। এমিল জোলার সেই ‘The Human Beast’ বা জৈবিক পশুটি যেমন ইউরোপের প্রাসাদে ও আভিজাত্যের আড়ালে দম্ভভরে বিচরণ করে, তেমনি ভারতের গহন অরণ্যের অরণ্যচারী মানুষের রক্তেও তা সমান্তরালভাবে বহমান। এই গবেষণা প্রবন্ধের আলোকপাতে যে বিষয়টি প্রখর হয়ে ওঠে তা হলো—সভ্যতার যতই সূক্ষ্ম প্রলেপ থাকুক না কেন, নির্দিষ্ট পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে মানুষের অবচেতন মনের ‘থানাটোস’ বা ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে দেখা যায়।
বর্তমান লিঙ্গীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই দুটি গল্প এক অমোঘ আয়না হিসেবে কাজ করে। আমরা দেখেছি কীভাবে পুরুষের ‘মালিকানাবোধ’ (Sense of Ownership) নারীকে কেবল একটি শরীর বা সম্পদে পরিণত করে। বিল্টুর কাছে বুধনী যেমন তার শক্তির দ্বারা অর্জিত ট্রফি, ফিফি-র কাছে রাচেল তেমনি বিজিত জাতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের যৌন-উপাদান। তবে মোপাসাঁ রাচেলকে একটি ‘এজেন্সি’ বা বৈপ্লবিক সক্রিয়তা দান করে ট্র্যাজেডিকে রাজনৈতিক মুক্তির স্তরে উন্নীত করেছেন, যেখানে বনফুল বুধনীকে এক চিরকালীন নীরব হাহাকারের গহ্বরে ফেলে রেখে মানুষের আদিমতার পরাজয়কে চিত্রিত করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, বনফুল ও মোপাসাঁ কেবল কথাশিল্পী নন, তাঁরা সমাজ-দেহের চিকিৎসক। তাঁদের ‘ক্লিনিক্যাল ডিটাচমেন্ট’ বা নির্লিপ্ততা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আধুনিকতার মেকি পোশাকের নিচে মানুষের শরীরতত্ত্ব ও প্রবৃত্তি আজও প্রাগৈতিহাসিক। বনফুলের সেই ‘পিত্ত জ্বলিয়া গেল’ আর মোপাসাঁ-র ডায়াগনস্টিক ব্যবচ্ছেদ—উভয়ই মানবিক সত্তার সেই জটিল সমীকরণকে উন্মোচন করে যেখানে যৌনতা, হিংসা এবং আধিপত্যবাদ একে অপরের পরিপূরক। এই গবেষণাটি তাই কেবল দুটি গল্পের পাঠ নয়, বরং মানব সভ্যতার অন্তঃসলিলা পাশবিকতার এক ঐতিহাসিক দালিলিক সংকলন যা সমকালীন সামাজিক অবক্ষয় ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার স্বরূপ বুঝতে আজও অপরিহার্য।
৯. সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
৯.১ তথ্যসূত্র
বনফুল (মুখোপাধ্যায়, বলাইচাঁদ)। “বুধনী।“ বনফুলের শ্রেষ্ঠ গল্প, বাণীশিল্প পাবলিশার্স, ২০০১, পৃ. ৩৮-৩৯।
Butler, Judith. Gender Trouble: Feminism and the Subversion of Identity. Routledge, 1990, pp. 25-40.
Foucault, Michel. The History of Sexuality, Volume 1: An Introduction. Translated by Robert Hurley, Pantheon Books, 1978, pp. 92-102.
Freud, Sigmund. Beyond the Pleasure Principle. Translated by James Strachey, Liveright, 1950, pp. 38-45.
---. Civilization and Its Discontents. Translated and Edited by James Strachey, W. W. Norton & Company, 1961, pp. 58-63.Maupassant, Guy de. "Mademoiselle Fifi." The Complete Short Stories, Penguin Classics, 1971, pp. 65-73.
Spivak, Gayatri Chakravorty. “Can the Subaltern Speak?” Marxism and the Interpretation of Culture, Edited by Cary Nelson and Lawrence Grossberg, University of Illinois Press, 1988, pp. 271-313.
Zola, Émile. “The Experimental Novel.” The Experimental Novel and Other Essays, Translated by Belle M. Sherman, Cassell Publishing Co., 1893, pp. 8-25.
৯.২ সহায়ক গ্রন্থ (Consulted Bibliography)
মজুমদার, উজ্জ্বল কুমার। সাহিত্যের রূপ ও রীতি। দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯৫।
Beauvoir, Simone de. The Second Sex. Translated by Constance Borde and Sheila Malovany-Chevallier, Vintage Books, 2011.
Cuddon, J. A. The Penguin Dictionary of Literary Terms and Literary Theory. Penguin Books, 2014.
Fanon, Frantz. The Wretched of the Earth. Translated by Richard Philcox, Grove Press, 2004.
Guha, Ranajit, editor. A Subaltern Studies Reader, 1986-1995. University of Minnesota Press, 1997.
Lacan, Jacques. Écrits: A Selection. Translated by Alan Sheridan, Routledge, 1977.
Maupassant, Guy de. "Preface to Pierre et Jean." Maupassant: Short Stories, translated by Marjorie Laurie, Everyman's Library, 1934.
Said, Edward W. Orientalism. Western Conceptions of the Orient, Penguin Books, 2003.
Showalter, Elaine. A Literature of Their Own: British Women Novelists from Brontë to Lessing. Princeton University Press, 1977.
Zola, Émile. La Bête Humaine. Translated by Roger Pearson, Oxford University Press, 1999.
Zola, Émile. The Experimental Novel and Other Essays. Translated by Belle M. Sherman, Cassell Publishing Co., 1893.