ANUSURJA RESEARCH JOURNAL
A Journal of Academic Research and Studies
"Inquiry at the intersection of literature, culture, society, and the post-modern."
Latest Publication ‘মানুষের সভ্যতা মায়ের শোণিত পান করে এগোয়’ – ঋত্বিকের সিনেমায় মাতৃপ্রতিমা ও পুরাণের বিদ্রোহী নারীরা — Laboni Akter
Read Full Article
Search Academic Database

Sponsor Us buying these products

নিম প্যাঁচা

রাধাচূড়া - ইন্ডিয়ান কটন কাপড়ের শর্ট কুর্তি

রাধাচূড়া - ইন্ডিয়ান কটন কাপড়ের শর্ট কুর্তি

নিম প্যাঁচা

কাদম্বরী - জয়পুরী কটন কাপড়ের শর্ট কুর্তি

কাদম্বরী - জয়পুরী কটন কাপড়ের শর্ট কুর্তি

Advertisement

Research Articles

Open Access

‘মানুষের সভ্যতা মায়ের শোণিত পান করে এগোয়’ – ঋত্বিকের সিনেমায় মাতৃপ্রতিমা ও পুরাণের বিদ্রোহী নারীরা

Laboni Akter · 04 Aug 2026
‘মানুষের সভ্যতা মায়ের শোণিত পান করে এগোয়’ – ঋত্বিকের সিনেমায় মাতৃপ্রতিমা ও পুরাণের বিদ্রোহী নারীরা

Abstract

মানুষের ‘সামষ্টিক অবচেতনে’ হাজার বছরের মিথ-পুরাণের ঐতিহ্য লুকিয়ে থাকে। ঋত্বিক ঘটক সভ্যতার ইতিহাস আর নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের কর্ষনের মধ্য দিয়ে পৌঁছাতে চেয়েছেন সেই মিথ পুরাণের কাছে। দেশভাগজনিত যন্ত্রণাবোধকে সিনেমায় ধারণ করতে গিয়ে নারীর শক্তির আশ্রয় নিয়েছেন বারবার। পুরাণের উমা, গৌরী, সীতা তার সিনেমায় বিদ্রোহী বেশে উপস্থিত হয়েছে। মাতৃপ্রতিমার রূপকল্পে নিজের দেশমাতার কাছেই ফিরে যাবার আকুতি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেট মাদার ইমেজ কে তিনি দ্বিখণ্ডিত বাংলার মিলনের আশাবাদের প্রতীকে তুলে ধরেছেন। তাঁর সিনেমায় বিশেষত মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখায় নীতা, অনসূয়া, সীতার মধ্য দিয়ে পুরাণের চরিত্রকে সমকালীন করে তুলেছেন। এছাড়া তিতাস একটি নদীর নাম এবং যুক্তি তক্কো আর গপ্পো তেও নারীকে এনেছেন শক্তির প্রতীকে। মাতৃপ্রতিমা আর পুরাণের মধ্য দিয়ে অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলিয়েছেন আর যেখান থেকে আস্থা রেখেছেন ভবিষ্যতে। মূল শব্দ: মাতৃপ্রতিমা, লোক-পুরাণ, কালেক্টিভ আনকনশাসনেস, উমা-গৌরী, দেশভাগ, Female Trinity

১.

“When a man denies the power of woman, he is denying his own subconscious.” - Amrita Pritam

সভ্যতার ইতিহাস সামষ্টিক চেতনাকে বয়ে নিয়েই এগিয়ে যায়। ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) হলেন সেই শিল্পী যিনি এই সামষ্টিক চেতনাকে ধারণ করেছেন তাঁর সিনেমার বয়নে, চরিত্রের গাঁথুনিতে। হাজার বছরের মিথ পুরাণকে নতুন আঙ্গিকে ব্যবহার করেছেন আস্থার প্রতীকে। একদিকে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জীবনের ব্যর্থতাবোধ হতাশা আর বিষাদ অন্যদিকে নিজভূমিতে পরবাসী হওয়ার যন্ত্রণাবোধ ব্যক্তি ঋত্বিকের মনে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল তাই শিল্পী ঋত্বিকের কাজের মধ্যে বারবার দেখতে পাই। আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রহসনকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ইতিহাসের কাছে, মিথ পুরাণের শক্তির কাছে। শেকড় সন্ধানী ঋত্বিক তাই নারীর শক্তিকে, মায়ের শক্তিকে উপলব্ধি করেছিলেন। মা, দয়িতা আর দেশ তাঁর কাছে একাকার হয়ে উঠেছিল। সেলুলয়েডের পর্দায় তাই একের পর এক মাতৃপ্রতিমার ছবি এঁকেছেন সভ্যতার প্রতীকে, আস্থার প্রতীকে। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় তাই তার সব নায়িকারই সৌন্দর্যের মূল আত্মশক্তি, লড়াই করে টিকে থাকবার দীক্ষা। মাতৃপ্রতিমা, great mother image এর যে রূপকল্প তিনি ব্যবহার করেছেন তা তাঁর তিনটি ছবির নায়িকার মধ্য দিয়ে- নীতা, অনসূয়া ও সীতা যথাক্রমে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্নরেখা’ (১৯৬২) অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঋত্বিকের সিনেমায় পুরাণের ভাবনাও শুরু এই ‘মেঘে ঢাকা তারা’ থেকেই আর যার ক্রম সম্প্রসারণ হয়েছে তাঁর পরবর্তী সবগুলো সিনেমায়।

মোট আটটি ফিচার ফিল্ম করেছেন। প্রথম ছবি ‘বেদেনি’ যা কখনও মুক্তিই পায়নি। তারাশঙ্করের ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছিলেন। নারী কেন্দ্রীকতাই ছিল তার প্রথম ছবির বিষয়। এরপর ‘নাগরিক’, যা তাঁর মৃত্যুর পর মুক্তি পেয়েছিলো। তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত আটটি সিনেমার মধ্যে ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮) ও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৮) তে সেই অর্থে কোন নায়িকা বা নারীর প্রাধান্য নেই। ‘অযান্ত্রিক’ এ নায়ক বিমলের প্রেম যন্ত্রের সঙ্গে। মানুষ আর যন্ত্রের সম্পর্কই অযান্ত্রিক আর এ থেকেই তাঁর আর্কেটাইপ ধারণারও শুরু। ঋত্বিক নিজেই বলেছেন -

আমার যে প্রোটাগনিস্ট বিমল, তাকে পাগল বলতে পারেন, শিশু বলতে পারেন, আদিবাসী বলতে পারে। কারণ এক জায়গাতে এই তিনই এক, সেটা হচ্ছে জড়বস্তুতে প্রাণ প্রয়োগ করার প্রবনতা। এবং এটি একটি আর্কেটাইপাল রিএকশন; আদিম প্রতিক্রিয়া, শিশুর যে কোন অসাঢ় বস্তু দেখে জুজু কল্পনা করা, পাগলের মেঘ দেখে খেপে ওঠা এবং আদিবাসীর প্রথম রেলগাড়ি দেখে তাকে দেবতা কল্পনা করা, একেবারে একই প্রতিক্রিয়া।

আর এভাবে যন্ত্রের আর্কেটাইপ থেকে ক্রমশ এগিয়েছেন নারীর আর্কেটাইপ, মায়ের প্রতিমার দিকে। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ থেকে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ পর্যন্ত শক্তির আধার হলো নারী। আর এই মাতৃপ্রতিমাই তাঁর সমস্ত সিনেমার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, কখনও ইতিহাসের ভূমিকায়, কখনওবা পুরাণের বিদ্রোহী নারীর ছায়া।


২.

‘আত্মানং বিদ্ধি’- উপনিষদীয় বাণীর প্রেরণায় ক্ষ্যাপা যেমন করে পরশপাথর খুঁজে ফেরে আবার মার্কস যাকে বলছেন, ‘finding the newest in what in oldest’- ঋত্বিকও তেমনি করে একজন সাংষ্কৃতিক নৃতত্ববিদের মন নিয়ে ভারতীয় জীবনের অন্তর্মূলে সুপ্ত চেতনাপ্রবাহকে খুঁজে ফিরেছেন তাঁর সিনেমায়। আর সেই দায়বদ্ধতা তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পুরাণের কাছে। কেননা মানুষের সভ্যতার বিকাশ, ইতিহাস, দর্শন লুকিয়ে আছে লোকপুরাণ ও মিথগুলির মধ্যে। বিশেষ সামাজিক সত্য ও তার অভিব্যক্তি অন্তর্নিহিত থাকে এই পুরাণকাহিনীর মধ্যে। ইয়ুং এই তত্ত্বে মোটামুটিভাবে যা বলতে চেয়েছেন তা হলো বিবর্তনের ধারায় যুগ যুগান্তর ধরে মানুষের অবচেতনে সঞ্চিত থাকে অসংখ্য বিশ্বাস-অভিজ্ঞতা-সংষ্কার ও জীবনপ্রণালী। এই অবচেতনতাকেই মানুষ কালপরম্পরায় বহন করে চলে। ব্যক্তির নির্জ্ঞান মনের স্তরে কেবল তার অবদমিত ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষায় বর্তমান থাকেনা, বিবর্তনগত Phylogenetic (জাতিগত) অভিজ্ঞান বিদ্যমান থাকে। আর এইজন্যই পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জীবনপ্রবাহের কিছু বৈশিষ্ট্যগত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিভিন্ন মিথ ও লোকপুরাণগুলির মাধ্যমে সমাকে একধরণের patterned sense of togetherness গড়ে ওঠে এবং তার মধ্যেই সমাকৃত থাকে মানবসমাজের প্রজাতিগত ঐক্যচেতনা। ঋত্বিক ইয়ুং এর এই যৌথ অবচেতনা তত্ত্ব দ্বারা আকর্ষিত ছিলেন। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন মানবজাতির এই যৌথ অবচেতনা মানুষের সংষ্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতির অফুরান ভান্ডার। আর ঠিক তাই পুরাণের আশ্রয় নিয়েছেন বারবার।

মাতৃপ্রতিমার রূপকে তিনি জরাজীর্ণ বিভক্ত বাংলার চেহারায় শান্তি খুঁজেছেন। নারীর শক্তির মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হয়েছেন আদিম যৌথজীবনের উৎসবে ফিরে যেতে। দ্বিধাবিভক্ত বাংলা তাকে যে যন্ত্রণাদদ্ধ করেছে তা কেবল স্বভূমিচ্যুত হয়ে যাওয়ার বেদনা নয়, সেই সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচ্যুত ব্যপক মানুষের হাহাকারের আর্তিও।

ঋত্বিক বলছেন -

"আমি শুধু এ কথাই বলতে পারি যে অতীতকে লঙ্ঘন করে, তাকে বিস্মৃত হয়ে আগে যাওয়া যায়না। আমার অতীত আমারই। আমি বিশ্বের এই ভূখন্ডে জন্মেছিলাম। আমার অতীত আমার কাছে গৌরবের বিষয়। আমি অতীতের জমিতে পা না রেখেই সেই দূর আকাশ ছুঁতে চাইনা যেখানে আমার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। আমি আমার নিজের অতীতের সঙ্গেই মানবসভ্যতার মুখ্য ধারার দিকে যেতে পারি।"

মানবসভ্যতার মুখ্য ধারার সঙ্গে একাত্ম হতে গিয়ে পুরাণ আর ইতিহাসের সেইসব নারীদেরকে ঋত্বিক যেভাবে ব্যবহার করছেন, ঋত্বিক নিজেই বলছেন -

"যেসব পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতীক ইঙ্গিত আমি আমার ছবিতে দিয়ে এনেছি সে সমস্তই প্রাথমিকভাবে মূল্যবান আস্থারই প্রতীক ছিল। পরে জনসাধারণের ধ্যানধারণা অনেকটা কলুষিত হয়েছে। আমার মনে হয়নি যে চরিত্রগুলি পুরাতনপন্থী বা তারা সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারা পোষণ করে। আমি কেবল এই অনুভব করছি যে মানবসভ্যতা দুধের মতোই মায়ের শোণিত পান করেই অগ্রসর হয়। মায়ের প্রতিচ্ছবি আমার কাছে এতটা মহত্বপূর্ণ বলেই মা সম্পর্কে পৌরাণিক চিন্তাচেতনার প্রতি আমার ভাবনা বারবার আকৃষ্ট হয়েছে। আপনি হয়তো বলতে পারেন যে আমি মাতৃগ্রন্থি স্বারা পীড়িত। আমার এক বন্ধু তো একবার বলেই বসলেন যে এই মা-ই তোমাকে খাবে। এই মাতৃপ্রতীক ব্যাপারটাকে কোন যুগবিশেষের সমাজব্যবস্থা বা রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভাবা খুব ভুল হবে। যাবতীয় সৃষ্টির মূলে মা হলো এক শাশ্বত শক্তি। সে কখনও বুড়ি হয়না। আমার প্রতিটি পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক চরিত্রই কোন না কোনভাবে বিদ্রোহী।"

মাতৃগ্রন্থি দ্বারা পীড়িত ঋত্বিক মাতৃপ্রতিমাকে দেখেছেন বিস্তৃত এক ক্যানভাসে। বলছেন ‘যাবতীয় সৃষ্টির মূলে শাশ্বত শক্তির’ কথা। যুগ যুগ ধরে শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষের শক্তির উৎস হিসেবে মাতৃশক্তিকেই চিহ্নিত করেছেন। ঋত্বিক নিজেই জানিয়েছেন তিনি মাকে ব্যবহার করেন কাব্যিক দ্যোতনায়, ধর্মীয় আঙ্গিকে নয়। বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম বা মার্কসবাদ-লেলিনবাদকে জীবনাদর্শ রূপে গ্রহণকারী গণনাট্যকর্মী ঋত্বিক ঘটক মাতৃপ্রতিমার মধ্যে শ্রেণীবৈষম্যের মুক্তির উপায় হিসেবে দেখেছেন। আর অবক্ষয়ী সামন্তবাদী সমাজ থেকে বেরিয়ে আসতে মাতৃপ্রতীকই তাঁদের কাছে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী মাধ্যম বলে মনে হয়েছিল। এই মাতৃপ্রতীক নিয়েই আমৃত্য কাজ করেছেন।

  • ঋত্বিক ঘটক মাতৃতান্ত্রিক ভাবপ্রতীক ব্যবহারের দিকে কেনইবা এত বেশি ঝুঁকেছিলেন। তার কিছু কারণ অনুসন্ধান করার প্রয়াস করা যেতে পারে -
  • ঋত্বিকের শিল্পী জীবন লেখালেখি ও নাট্যজগত দিয়ে শুরু। আধুনিক নাট্যজগত থেকে বেরিয়ে গণনাট্যে এলেন। শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদকে একীভূত করা যায় এমন ভাবপ্রতীক খুঁজছিলেন। মাতৃপ্রতীক ব্যবহারের প্রাথমিক উৎস মূলত জনগণের মুক্তির উপায়কে সাম্যবাদী সমাজের রূপরেখায় স্থাপন করা।
  • অবক্ষয়ী, সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর অবস্থানকে জোরদার করার লক্ষ্যে নারীর মাতৃপ্রতিমা রূপায়ন।
  • হাজার বছরের নিপীড়িত জনগণ তাদের মুক্তিকল্পে নারীকে শক্তি হিসেবে আরাধনা করে এসেছেন, সেই শক্তিরূপিনীকে শিল্পে রূপ দিতে চেয়েছেন।
  • ধর্মতাত্ত্বিক যে দেশ গড়ে উঠলো ’৪৭ এ জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষ কিছু মূল্যবোধ হারায়নি তার একটি হলো মাতৃতান্ত্রিকতা। এই ঐতিহ্যিক আকর্ষণও অন্যতম কারণ।
  • অন্য যে বিষয়টি অনুপ্রাণিত করেছিল তা হলো ব্রেটল ব্রেশটের মাতৃতান্ত্রিক ঝোঁক। যেখানে ব্রেশট শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমজীবি নরনারীর সংগ্রাম ও বিপ্লবকে প্রতীকায়িত করেছেন- ‘মাদার কারেজ’, ‘ককেশিয়ান চক সার্কেল’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ নাটকের মঞ্চায়ন ও মাতৃতান্ত্রিকতার সপক্ষে একটা অগ্রসর ভাবনা ছিল।


চিত্র: আদি দুর্গা


মাতৃপ্রতিমার আদিশক্তি রূপে ঋত্বিকের নায়িকারা সেলুলয়েডের পর্দায় চিরায়ত শক্তির তরঙ্গে ভেসে বেড়ায়। তাইতো শেষ পর্যন্ত তাঁর নায়িকারা মানবীর বদলে ‘মেটাফোর’ হয়ে ওঠেন। পৌরাণিক গাঁথা, উপকথা-মিথে তাঁর নায়িকারা শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করেন যা সমকালকে ছাড়িয়ে মহাকালকে স্পর্শ করে। ইয়ুং এর সামষ্টিক অবচেতনকে ধারণ করেন ঋত্বিকের মাতৃপ্রতিমা ও মিথ পুরাণের বিদ্রোহী চরিত্রেরা যা নীতা, সীতা, অনসূয়া, বাসন্তী, দুর্গা, বঙ্গবালার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।


৩.

ধর্মের দোহাই দিয়ে কাঁটাতারে ভাগ করে ফেলা হলো হাজার বছরের ঐতিহ্যকে, জন্ম নিল দুটি দেশ- পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান। বাংলা হলো দ্বিখন্ডিত। এ কেবল জমি ভাগ নয়। এ হলো হাজার বছরের সংষ্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের দ্বিখন্ডিকরণ প্রক্রিয়া। আর এই যন্ত্রণায় যিনি আমৃত্যু পুড়েছেন তিনি সিনেমার ‘নীলকন্ঠ’ ঋত্বিক ঘটক। মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্নরেখা (১৯৬২) কে বলা যায় সেই যন্ত্রণার ত্রয়ী প্রকাশ। আর তাঁর সেই যন্ত্রণাকে ধারণ করেছেন তিন নারী- নীতা, অনসূয়া আর সীতা। সাহস, সততা আর মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে মাতৃরূপে আবির্ভূত হয়েছেন এই তিন চরিত্র। প্রেম ও আত্মত্যাগের পরিপূরক এই আর্কেটাইপ নারীরা।


‘মেঘে ঢাকা তারা’ নীতারই গল্প। সিনেমার শুরুতেই এক বিশাল বৃক্ষের পেছন থেকে নীতা বেরিয়ে আসে। সেই বৃহদাকায় বৃক্ষ আর নীতা যেন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই বৃক্ষের যে বিশালত্ব তাকেই নীতা ধারণ করেছে। নীতা চরিত্রটি খুবই মনস্তাত্ত্বিক- পুরাণ নির্ভর। বিশাল বৃক্ষের ব্যাকগ্রাউন্ডের মধ্য দিয়েই ঋত্বিক নীতার ‘গ্রেট মাদার ইমেজের’ রূপকল্পের আভাস দিয়ে দেন। একটি সাধারণ গল্পের একটি মেয়ে সংসারের জন্য মরণপণ লড়াই করে শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মা রোগে মারা গেল; মা-বাবা, গীতা, মন্টু, শঙ্কর আর সনতের মধ্য দিয়ে নীতা জগৎদাত্রী সেই বৃক্ষেরই মতো। কিন্তু ঋত্বিকের হাতে এই সাধারন গল্পের সাধারণ নীতা সিনেমার শরীরে দূর্গার রূপকল্পে অসাধারণ হয়ে ওঠে। ট্র্যাজেডির নায়িকা নীতার পাহাড় দেখার আকাঙ্ক্ষা নিতান্তই ইচ্ছা নয়।


চিত্রঃ২ – ‘মেঘে ঢাকা তারা’ প্রথম দৃশ্য




মিথের কাছেই ঋত্বিক আশ্রয় নিচ্ছেন। পাহাড়ে শিবের কাছেই দুর্গার প্রত্যাবর্তন, বরাভয়দাত্রীর বাপের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার লৌকিক চেতনা প্রকাশ পায়। দেশভাগে উদ্বাস্তু একটি পরিবার, নীতার পরিবার মন্বন্তর আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পঞ্চাশের কলকাতায় এক কলোনিতে বাস করে। অর্থনৈতিকভাবে পুরো পরিবার নির্ভর করে নীতার উপর। মায়ের সাথে যার দূরত্ব, যার যা স্বার্থের গন্ডি থেকে বের হতে পারেনা, যে মা বলে- “প্যাটের মাইয়া তবু যেন দূরের মানুষ।” এই ‘দূরের মানুষ’ নীতা তার দাদা শঙ্করকে বলে- “বিয়ে আমি করবোইনা। তুই যেদিন বিরাট হবি, সেদিন বিয়ে করবো। তদ্দিন আমি কি নেই? তারপর আমার সব কষ্ট হারিয়ে যাবে।” এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই নীতা বলে ওঠে- “সেদিন আমায় পাহাড়ে নিয়ে যাবি তো? খোলামেলা উঁচু-নিচু জায়গায় খুব কষে হইচই করবো। খুব ছুটোছুটি করবো।” পরপর নীতার মনের এই অভিব্যক্তি দ্বান্দ্বিক দ্বিবাচনিকতায় তাৎপর্যমন্ডিত। ‘তদ্দিন আমি কি নেই?’ আর ‘খুব ছুটোছুটি করবো’ দুই বিপরীত স্বভাষণ নীতাকে মহাকালের মহামিলনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার জন্মদিন জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন। ঋত্বিক তাকে উমার সিম্বলিজমে গড়ে তোলেন গৌরীদানের প্রতীকে। বাঙালি জীবনধারার যে স্রোতটি দীর্ঘকাল ধরে এদেশের মানুষের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল তার অন্যতম হলো গৌরীদান। আট বছরের কুমারী কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার প্রথা হলো এই গৌরীদান। যেই ছোট্ট বয়সে মেয়েটির মেতে থাকার কথা খেলাধূলায়, সেই বয়সে বয়সে ভয়, সংশয়, জড়তা নিয়ে অচেনা পরিবেশে, অচেনা পরিবারের অংশী হয়ে উঠতো। আর এই জঘন্য প্রথাকে বাঙালি সমাজ দীর্ঘকাল ‘গৌরীদানের’ পূণ্য লাভের আশায় মেতেছিল। এভাবে বাঙালি জীবনের নানা আলেখ্য, অসংখ্য কাহিনী, ছড়া, পালাগান আর দেবদেবী বিষয়ক আখ্যানের মধ্যে গৌরীদানের বিষয়টি নানাভাবে পরিব্যাপ্ত ছিল। ঋত্বিকও সেই হাজার বছরের ঐতিহ্যের ইঙ্গিত নীতার মধ্য দিয়ে ধরতে চেয়েছেন যার জন্ম জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে, সেই গৌরীদানের উদযাপনের সময়ে। ঋত্বিক এখানে নীতাকেই গৌরীতে রূপান্তরিত করলেন। নীতার ব্যথা-বেদনা শাশ্বতকালের হয়ে উঠলো যার মধ্যে আছে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। যে গৌরীদানের পূণ্যে বাবা-মায়ের পূণ্য হতো, সেই গৌরীদানের পূণ্য নয় বরং গৌরীকেই অর্থাৎ নীতাকেই অবলম্বন করে বেঁচে থাকে নীতার পরিবার।

নীতাই গৌরী-উমা; তার স্বামী মহাকাল, মহাদেব, পাহাড় যার প্রতীক। সেই পাহাড়ের কোলেই তার মৃত্যু। তাইতো নেপথ্যে ঋত্বিক বারবার ব্যবহার করছেন ‘আয় গো উমা কোলে লই... যাও গো ঝি জামাইয়ের ঘর’। নীতার শেষ আকুতিতে এই মিলনের সুর, শিব গৌরীর এই উপকথা বর্তমানের জীবনের সাথে রূপায়িত করে ঋত্বিক ঘটক তাকে চিরকালের করে তুললেন। মায়ের চিরায়ত রূপ অন্নপূর্ণা গৌরীর প্রতীকে বিরাটত্ব ধারণ করে উঠলো ঋত্বিকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমায়। দেবী দূর্গার সাথে তিনি নীতাকে মিলিয়ে দেন। ঋত্বিক নিজেই বলছেন, “নীতা আজ পর্যন্ত আমার সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। তাকে আমি কল্পনা করেছি শত শত বছরের বাঙালি ঘরের গৌরীদান দেওয়া মেয়ের প্রতীক রূপে।”

ঐতিহ্য আর মহাকাব্যিক দ্যোতনা দুটোকেই যে চরিত্রটি ধারণ করেছে সে হলো অনসূয়া। রবীন্দ্রনাথা, বিষ্ণু দে পেরিয়ে এবার ঋত্বিকের কোমল গান্ধারে এসে ধরা দিল পুরাণের অনসূয়া। ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) যেন আধুনিককালে শকুন্তলার রূপ ধরলেন অনসূয়া চরিত্রে। নায়ক ভৃগু হলো দুষ্মন্ত। আর এই মিথ বা আর্কেটাইপের মধ্যে ঋত্বিক তাঁর ইতিহাসের কাছে, ঐতিহ্যের কাছে ফিরতে চাইলেন, দেখতে চাইলেন দুই বাংলার মিলনের মুহুর্ত। সিনেমার একটি দৃশ্যে ক্যামেরা রেললাইনের ওপর দিয়ে অতি দ্রুত এগিয়ে, ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে যায় আর অনসূয়া বলে ওঠে ‘ওপারে আমার স্বদেশ’। শকুন্তলারূপী অনসূয়া এই দেশে পরবাসী। দেশভাগের ফলে সে উদ্বাস্তু এবং একা। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র উমা কোমল গান্ধারে এসে হয়ে উঠলেন অনসূয়া। এ সম্পর্কে ঋত্বিক নিজে বলছেন-

"বাংলাদেশের শকুন্তলার প্রতিমূর্তি এই ছবির নায়িকা শকুন্তলা বাংলাদেশে পরিণত হয় আমার কাছে। চারপাশে যে দ্বিধা, যে ভাঙন আমি জানি- তার মূল হচ্ছে ভাঙা বাংলা। ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে রয়েছে তিন স্তর। আমি অনসূয়ার দ্বিধাবিভক্ত মন, বাংলাদেশের গণনাট্য আন্দোলনের দ্বিধাগ্রস্থ নেতৃত্ব এবং দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশের মর্মবেদনা- তিনটিকেই একত্রে টানতে চেয়েছিলাম।"

আর এই ত্রি-দ্বিধা কে মেলানো, ভাঙা বাংলাকে মেলানোর স্বপ্ন দেখেছেন ঋত্বিক। পুরো সিনেমা জুড়েই মিলনের গান, বিয়ের গান- ‘ব্রাক্ষ্মণে চিত্রাইছে পিঁড়ি মধ্যে সোনা দিয়া, আইজ হইবে সীতার বিয়া’। আবার মিথের আশ্রয়, যেকোন ভাঙনের বিপরীতেই ঋত্বিকের মিলনের সুর প্রকাশিত হয়ে উঠেছে পুরাণের আশ্রয়ে।


চিত্রঃ৩ – ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য


মাতৃভাবনার প্রকাশ কোমল গান্ধারেও প্রকাশিত। অনসূয়া যে কিনা বারবার তার মায়ের কথা বলে, মায়ের দৃঢ়তার কথা বলে, মা যেন অদৃশ্য শক্তিরূপিনী। যার ডায়রি পরম আস্থায় তুলে দেয় ভৃগুর হাতে। মায়ের স্মৃতি হয়ে ওঠে সমস্ত ভাঙন আর অবক্ষয়ের বিপরীতে এক শাশ্বত প্রতিমা। আবার ভিখারি বালকের মুখে মা ডাক শকুন্তলারূপী অনসূয়া খুঁজে পায় নতুন দিকনির্দেশনা, আগলে রাখে সে ভাঙন ধরা দুটি নাট্যদলকে। অন্যদিকে গ্রাম্য এক বৃদ্ধ মাতার মাতৃসত্তার তৃপ্তি, ভৃগুকে সে নিজের সন্তানের মেডেল উপহার দেয় যা নাট্যসংঘের ভাঙনের মুখে পরম সান্ত্বনার কাজ করে।

শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রাকালীন যে বেদনা, প্রকৃতি ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে যন্ত্রণা, শেকড় উপড়ে চলে যাওয়ার যে যন্ত্রণা তাকেই ঋত্বিক কোমল গান্ধারে অনসূয়ার মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। শকুন্তলার মতো সেও শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন। শকুন্তলা-দুষ্মন্তের এপিকের পূনর্নিমাণ করেন ঋত্বিক সেই যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে।

‘সুবর্নরেখা’ (১৯৬২) কে বলা যায় আধুনিক রামায়ন। কাহিনী বিন্যাসে আছে রাম সীতার উপকথা। যে রাম সীতাকে পেয়েও হারায়, আবার হারিয়ে পেয়ে যায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি। সেই পুরাণকে আশ্রয় করে ঘর হারানো, ঘর বাঁধা আবার সব হারানোর ছবি রচনা করেন ‘সুবর্নরেখা’ তে। রামায়নের চিরন্তন ট্র্যাজেডি- সর্বংসহা সীতার তিরোধানে সিনেমাতেও আশ্রয় পেয়েছে তবে তা মিথলজির অনুকরণ নয় বরং প্রাচীণ এই উপকথাকে নতুন রূপ দেন একাল আর সেকালের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। অতীতের সাথে যোগ বিয়োগের মধ্য দিয়ে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। পুরাণ কথা তাই অতীত হয়েও নবীন।

রাম-সীতা উপকথা নানাভাবে বর্ণিত আছে। এই উপকথাকে নানান ফর্মে নতুন রূপে মানবিক করে তোলার প্রয়াস দেখা গেছে। প্রথম দেখি মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে যেখানে ব্যক্তির জাগরণই মূখ্য, দ্বিতীয় দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ তে যেখানে ধনতন্ত্র বিরোধিতা প্রধান হয়ে উঠেছে। আর শেষটায় দেখি ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্নরেখা’য় যেখানে পূর্ববর্তী দুটো বিষয়ের সাথে যোগ দিয়েছে সমাজবাস্তবতা।

কাহিনীবিন্যাসের পটভূমিতে এই যে রাম-সীতা উপকথা রামায়নের কাহিনী যা মূলত আদিম উপকথা, সীতা যার সাথে মিশে আছে শস্য রক্ষা জয়গান, বিবাহ-মৃত্যু-পুনর্জন্মের আখ্যান। রাম সীতাকে পেয়েও হারান, হারিয়ে আবার পান। সুবর্নরেখাতেও এই ব্যাপার ঘটেছে- ঘর বাঁধা, ঘর ভাঙ্গা, এক স্থান থেকে অন্য স্থান, জীবন থেকে মৃত্যু, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবার নতুন করে পথচলা- বিনু আর ঈশ্বরের পথ চলা, যা চিরন্তন, যা কখনও পুরনো হয়না। অতীত আর বর্তমানের দ্বান্দ্বিক অভিঘাতে ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় আর এই সংঘাত-সম্মেলনেই শিল্পের সার্থকতা। ঋত্বিক অতীতের সীতাকে তুলে এনে বর্তমানে যেমন বসিয়ে দেন তেমনি করে ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও দিয়ে দেন। এজন্যই তিনি অহংকার করে বলতে পারেন- “আমার ছবিতে দেখো সমগ্র মানবসভ্যতাকে”। এভাবেই সাংষ্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমকালের মধ্য দিয়ে সমগ্রকালের সাথে ব্যপ্ত করে তোলেন। ঋত্বিক সুবর্নরেখা সম্পর্কে নিজে বলছেন-

“আমাদের নায়িকা যখন ছোট্টটি, তখন সে একদিন সুবর্নরেখা নদীর ধারে ঘন শালবনের মধ্যে এক বিরাট ভাঙা airport আবিষ্কার করে। ওর ভারি মজা লাগে। ভাঙা এরোপ্লেনগুলো দেখে ওর শোনা কথাগুলো মনে পড়ে যে, এগুলোতে চেপে মার্কিন সাহেবরা রাত্তির বেলাতে উড়ে গিয়ে সেই কোথায় এক বর্মাদেশে তার ঘুমিয়ে থাকা শহরগুলোর ওপর বোমা ফেলে আসতো। আর এই যে নীরব ক্লাবঘর, এখানে কত হৈচৈ-ই না হত, সাহেবগুলো বোমা ফেলে এসে এইখানে হৈ-হুল্লোড় করত। ভারি খুশি হয়ে মেয়েটি যখন হাততালি দিয়ে নেচে নেচে সেই ফাটল ধরে যাওয়া সুবিশাল অ্যাসফল্টের শ্মশানের ওপরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়ালো এক বীভৎস কালীমূর্তি। আঁতকে উঠে মেয়েটি আশ্রয় নিলো পথচারী অপর এক চরিত্রের কোলে। তখন জানলো কালীমূর্তিওয়ালীটি আসলে এক বহুরূপী, যে শুধু পেটের ভাতের পয়সার জন্য এইরকম সাজে। সে ছোট্ট দিদিমণিকে ভয় দেখাতে চায়নি, শুধু সামনে পড়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, গোটা মানবসভ্যতা ঐ terrible mother এর archetypal image এর সামনে পড়ে গেছে। আজ সব সভ্যতার জীবন মরণ সমস্যা ঐ confrontation এর ওপরে।”

‘সামষ্টিক সামাজিক চেতনা’কে ঋত্বিক তাঁর যন্ত্রণা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম করে তুলেছিলেন যেখানে নারীই হয়ে উঠেছিল প্রধান শক্তি।


মাতৃপ্রতিমা ও পুরাণের নারীদের সমাবেশ দেখা যায় তাঁর মহাকাব্যিক সিনেমা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এ। যেখানে ভগবতীর রূপকল্প ব্যবহার করে ঋত্বিক ‘Female Trinity’র বিষয়টিকেও সেলুলয়েডে বন্দী করেছেন। ভারতীয় মিথ পুরাণে যে ‘Male Trinity’- ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, শিব এর কথা বলা হয়, ঋত্বিক সেই সৃষ্টি, লালন আর ধ্বংসের প্রতীকে Female Trinity বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। মায়ের নানা রূপ দেখি বাসন্তী, রাজার ঝি আর উদয়তারার মধ্য দিয়ে। অতীতের সাথে এক অমোচনীয় সম্পর্ক স্থাপন করে দেন যখন বাসন্তী বলে- “রমা একটা জিনিসই বুঝলাম, এ দুনিয়াতে মাই সব, মা ছাড়া আর কিছুই নাই।”

এই ‘মা’ এরই আরেক রূপ ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার বঙ্গবালা। বঙ্গবালা হলো ঋত্বিকের বাংলাদেশ। দ্বিখন্ডিত হয়ে যাওয়া ইতিহাস, ঐতিহ্যের বেদনা তাকে জর্জরিত করেছে প্রতিনিয়ত। শেষবেলায় এসে বঙ্গবালার মুখে ঋত্বিক সেই দেশকে খুঁজেছেন। গান গাইছেন-

“কেন চেয়ে আছো গো মা মুখ পানে

কেন চেয়ে আছো গো মা

এরা চাহেনা তোমারে চাহেনা যে

আপন মায়ের নাহি জানে

এরা তোমায় কিছু দেবেনা

মিথ্যা কহে শুধু কত কি ভানে।”


চিত্রঃ ৪ – ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য


এই যন্ত্রণাকে ধারণ করেছেন ঋত্বিক অতীতের বিদ্রোহী নারী মায়ের রূপকল্পে। এই ‘মা’ প্রয়োজনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। নারীর শক্তি কথা প্রকাশ হয় যখন ওস্তাদ পঞ্চানন বঙ্গবালাকে দুর্গার মুখোশ পরিয়ে বলে-

“নাচো, মা নাচো, তোমরা না নাচলে আমরা বাঁচি কী করে?”

সভ্যতা সেই মায়ের শোণিত পান করেই টিকে আছে হাজার বছর ধরে। একরূপে তিনি উমা-গৌরী-অন্নপূর্ণা আর রূপে ভয়ংকরী কালী-চন্ডী-ছিন্নমস্তা। ইতি আর নেতির এই রূপ ছাপিয়ে নারীর শক্তি ও মমতায় টিকে আছে মানবসমাজ। ঋত্বিক তাঁর ট্রিলজিতে প্রেমে, শিল্পে, ব্যক্তির জাগরণে ও প্রতিষ্ঠায় নীতা, অনসূয়া ও সীতাকে সেই শক্তির প্রতীকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। বাসন্তী-বঙ্গবালা সেই রূপকে আরো বর্ধিত করেছে। মাতৃপ্রতিমা আর পুরাণের মধ্য দিয়ে অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলিয়েছেন, যেখান থেকে ভবিষ্যতের প্রতি তাঁর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। সেই নিরিখেই মাতৃপ্রতিমা আর পুরাণের নারী ভাবনা ঋত্বিকের ছবির গুরুত্ব ও সার্থকতা বহন করে।


তথ্যসূত্রঃ

১. মুখোপাধ্যায়, চন্ডী (মাঘ ১৪২২) ‘ঋত্বিক ঘটকের নায়িকারা’ উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত; কবিতীর্থ, কলকাতা

২. সোনি, বিজয়, নেত্র সিং রাওয়াত, মানুষের সভ্যতা মায়ের শোণিত পান করেই এগোয় (১৯৮৬), শিবাদিত দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাঃ সাক্ষাৎ ঋত্বিক, কলকাতা

৩. প্রাগুক্ত

৪. দাশগুপ্ত, রনেশ, ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য ও মাতৃতন্ত্র, সাক্ষাৎ ঋত্বিক

৫. ঘটক, ঋত্বিক, মানবসমাজ, আমাদের ঐতিহ্য, ছবি করা ও আমার প্রচেষ্টা, চলচ্চিত্র চর্চা পত্রিকা (২০১৭), সম্পাঃ বিভাস মুখোপাধ্যায়, কলকাতা



Download PDF
— End of Article —

How to Cite

Laboni Akter. "‘মানুষের সভ্যতা মায়ের শোণিত পান করে এগোয়’ – ঋত্বিকের সিনেমায় মাতৃপ্রতিমা ও পুরাণের বিদ্রোহী নারীরা." 2026.

Republished — originally published elsewhere


Featured Books & Journals
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাহিত্যের রূপান্তর ও প্রাসঙ্গিকতা
Research Book
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাহিত্যের রূপান্তর ও প্রাসঙ্গিকতা
Adaptation & Pertinence of Literature in Bangladeshi Cinema
Laboni Akter
Bangladesh Film Archive (BFA), 2020
BDT 250
তিতাস একটি নদীর নাম ও সূর্য দীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রে নারীবাদী অস্তিত্বের পুনর্পাঠ
Research Book
তিতাস একটি নদীর নাম ও সূর্য দীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রে নারীবাদী অস্তিত্বের পুনর্পাঠ
Reinterpretation of feminist existence in the films of Titas Ekti Naadir Naam & Surja Dighal Bari
Laboni Akter
Bangladesh Film Archive, 2023
BDT 275