শিল্প মানুষকে তার যাপিত বাস্তবতার কোন একটি বিশেষ মুহুর্ত বা ঘটনার সামনে মনোসংযোগ করতে সাহায্য করে। শিল্প তাই সুনির্দিষ্ট কোন সীমানায় আটকে থাকেনা। বরং তা আপেক্ষিক। তাই এর সৌন্দর্য অনুধাবন, উপস্থাপন রীতি ও রসাস্বাদন নিয়েও তৈরী হয় নানা মত। বাস্তবের সবচেয়ে কোলঘেঁষা ও মানব ইতিহাসের আধুনিকতম শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্র শিল্প। চলচ্চিত্র মূলত শৈল্পিক, আদর্শিক ও দার্শনিক ভাবনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সমাজবাস্তবতা এবং সামাজিক সংঘাতকে তুলে ধরে। তবে এ কথাও সত্য যে, বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদী আধিপত্য চলচ্চিত্র শিল্পকে পুরোপুরি মুক্ত হতে দেয়নি কখনোই। কেননা চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে অর্থের যোগ রয়েছে আর মুনাফার সাথে রয়েছে বেশি সংখ্যক দর্শকের সম্পর্ক, ফলে রয়েছে বেশি মানুষকে ভ্রমে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা। এই পুঁজিবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য থেকে চলচ্চিত্রে শুরু থেকে পুরুষের আধিপত্য রয়েছে। যা স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের চোখে দেখা পৃথিবী; সমাজ, সভ্যতা ও নারীর রূপায়নকেই ত্বরান্বিত করেছে। আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় ‘বাংলাদেশের নারী নির্মাতার চলচ্চিত্রে নারীর জীবন ও জগৎ’। অর্থাৎ নারীর চোখে নারীর পৃথিবী কেমন, সে বিষয়ক অনুসন্ধান। একই সাথে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোয় নারীর জীবন ও জগৎকে বোঝারও প্রয়াস।
বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি
প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানসিক চিন্তার প্রকাশ মাধ্যমও বটে। চলচ্চিত্রের মধ্যে থাকে একটি জীবনদর্শন, যা প্রচলিত সমাজকাঠামোকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে এবং সমাধানের পথের দিকে ধাবিত করে, নতুন করে চিন্তা করতে শেখায় এবং দর্শকের মননে আঘাত করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে চলচ্চিত্রের মতো একটি শিল্পমাধ্যমে নারীর অবস্থান কোথায়? নির্মাতা হিসেবে, চলচ্চিত্রের চরিত্র হিসেবে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্বিক অবস্থান ও উপস্থাপন কেমন এ প্রবন্ধ সে বিষয়ে একটি পথের দিশা দিতে না পারলেও পর্যালোচনা করতে ও ভাবতে সাহায্য করবে।
মূলত দুটি বিষয়কে সামনে রেখে এই অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের মতো আর্থ—সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী চলচ্চিত্র নির্মাতার নিজেদের অবস্থান। দ্বিতীয়ত, সেই প্রেক্ষিতের মধ্যে থেকে তাদের চলচ্চিত্রে নারীর রূপায়ন, চলচ্চিত্রে ভাষা কাঠামোয় কোনও ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় কিনা এবং নারীর ব্যক্তিত্ব, অস্তিত্ব নির্মাণে কোন বাস্তবতাকে আধেয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন সে বিষয়ক পর্যালোচনা।
যখন আমরা নারীর চলচ্চিত্রে নারী বলছি তখন আরেকটি ভাগ বা ধারা তৈরী হয়ে যায়, তা হলো — পুরুষের চলচ্চিত্রে নারী। কেননা আর্থ—সামাজিক—রাজনৈতিক—লৈঙ্গিক বাস্তবতায় নারী ও পুরুষের যাপন, অনুধাবন ও অস্তিত্ব দুটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। ফলে পুরুষ নির্মাতার চলচ্চিত্রে নারীর জগত জীবনের যে ছবি আমরা দেখতে পাই, তার সাথে নারীর দেখার ও অনুধাবনের মিল থাকতেও পারে, নাও পারে। নারীর দেখা জগত সেখানে প্রায়ই অনাবিষ্কৃত। তবে কোনও কোনও পুরুষ চলচ্চিত্রকার সংবেদনশীলভাবে নারীর জগতকে উন্মোচন করেছেন তাদের চলচ্চিত্রে, যেমনঃ সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক, ইঙ্গমার বার্গম্যান, ফেদেরিকো ফেলিনি, জ্য লুক গদার প্রমুখ।
গুণগত আধেয় বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধটি সম্পাদনার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। সেই সাথে চলচ্চিত্রগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের জন্য আখ্যানবিদ্যা বা ন্যারেটোলজি পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
“ন্যারেটোলজি হলো, যে পদ্ধতিতে কোন ন্যারেটিভ বা বয়ান বা আখ্যান আমাদের সাংষ্কৃতিক অনুষঙ্গ এবং চারপাশের জগৎ সম্পর্কে অনুধাবন গড়ে তোলে, তার পাঠ। ন্যারেটোলজি পদ্ধতিতে বিভিন্ন চরিত্রের আচরণ বিশ্লেষণ করা হয় দৃশ্যপরম্পরায়, তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে উন্মোচনের তাগিদ থেকে।” (গায়েন, ২০১৩)
ফরাসি তাত্ত্বিক জেরার্ড জেনেট তার ‘ন্যারেটিভ ডিসকোর্স’ (১৯৮০) বইয়ে চলচ্চিত্রের আখ্যানবিদ্যার তিন ধরনের উপাদানের কথা বলেছেন — কাহিনী, বক্তব্য এবং আঙ্গিক। আলোচ্য চলচ্চিত্রগুলি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই তিন উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্মাতারা তাদের চলচ্চিত্রে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন তা উদঘাটনের প্রয়াস নেওয়া হবে।
তাত্ত্বিক কাঠামো
আলোচ্য প্রবন্ধটি বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে নেওয়া হয়েছে লরা মালভির নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব এবং বেটি ফ্রাইডানের নারীবাদী চিন্তাধারাকে।
’৭০ এর দশকের শেষে নারীবাদের বিকাশের কালে নারীবাদী চলচ্চিত্র চিন্তাও বিকশিত হতে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় বৃটিশ তাত্ত্বিক লরা মালভি একটি তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন। ১৯৭৫ সালে ‘ভিজ্যুয়াল প্লেজার এন্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ প্রবন্ধে তিনি মূলত হলিউডের মূলধারার ন্যারেটিভ সিনেমায় নারীর উপস্থাপনের ধরণ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নেয় পূর্ববর্তী তাত্ত্বিকদের থেকে। তিনি বলছেন চলচ্চিত্রের ফর্ম এবং যন্ত্রকল্প (অ্যাপারেটাস) এ দুইয়ে মিলে যে গতানুগতিক চলচ্চিত্র ফর্ম তৈরী করে তা কখনোই নারীর যথার্থ প্রতিরূপায়নে সহায়ক নয় বরং তা পিতৃতন্ত্রের আকরেই গ্রথিত। মালভির প্রবন্ধে আরেকটি যুগান্তকারী যোগ ছিল ফ্রয়েড ও লাঁকার মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব। মূলত মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব ব্যবহার করে মালভি বলতে চাইছেন, চলচ্চিত্রে যে ‘দেখা’র কাঠামো ব্যবহৃত হয় তা মূলত পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক যৌনতা দ্বারা সংজ্ঞায়িত। দেখার বিধয়ী সবসময় (পুরুষ না হলেও) পুরুষধর্মী আর বিধেয় সবসময় নারী। তাঁর মতে, পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখতে চলচ্চিত্রগুলো নারীর এমন অবয়ব তৈরী করেছে, যেখানে নারীর নিজস্বতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা কখনোই গুরুত্ব পায়নি; বরং নারীরূপকে কাঠামোবদ্ধ করেছে এবং সমাজে ‘অপর’ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁর মতে পুরুষ চরিত্র সর্বদা সক্রিয় ও শক্তিশালী থাকে আর নারীকে উপস্থাপন করা হয় পুরুষের কাঙ্ক্ষিত বস্তু হিসেবে নিষ্ক্রিয়, শক্তিহীন এবং পুরুষ চরিত্রটির গঠনে শুধুমাত্র সহায়ক রূপে। এই প্রেক্ষিতে নারীর নিজস্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি ‘কাউন্টার সিনেমা’র কথা বলেছেন।
অন্যদিকে বেটি ফ্রাইডেন তাঁর বই ‘দ্য ফেমিনিন মিস্টিক’ (১৯৬৩) এ পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি নারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার আলোকে নারীর ব্যক্তিপরিচয়ে নির্মাণের পথে নানাবিধ অন্তরায় তুলে ধরে একটি তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, নারীর ব্যক্তিজীবন, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর যাপিত জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই ঘরের বাইরে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে একদিকে যেমন নারীর ক্ষমতায়ন ঘটে, অন্যদিকে প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে। বেটি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য উভয়ের সমকালীন সমাজকে আর্থ—সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রেক্ষিতে নারীর মা, স্ত্রী পরিচয়ের বাইরে নারীর আত্মপরিচয় ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
আলোচ্য তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে মূলত বাংলাদেশের নারী নির্মাতাদের নিজস্ব জগত ও পর্দায় প্রতিফলিত জীবনের অর্থ উদঘাটনের মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থানের স্বরূপ অনুধাবনের প্রয়াস করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র ও নারী
পুঁজিবাদ এবং পিতৃতান্ত্রিক একটি সমাজকাঠামোতে নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত আছে তা চলচ্চিত্রের পর্দায়ও পুনর্নির্মিত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন ঐ একই কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কখনো নারী আবেদনময়ী, কখনো লাস্যময়ী, কখনো যৌনতার আধার বা অশ্লীলতার ধারক — এসব রূপে উপস্থাপিত। আবার বিপরীতে নারীকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে মমতাময়ী, কোমল বা দেবীত্বে উত্তীর্ণ করার প্রবণতাও লক্ষনীয়। বর্তমানে চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থিতি নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা—সমালোচনা চলছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারীর রূপায়ন — এ বিষয়টি নিয়েও অল্পবিস্তর গবেষণা গ্রন্থ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ লেখা হয়েছে। যেমনঃ ড. কাবেরী গায়েনের ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নারী নির্মাণ’, অনুপম হাসানের ‘সাহিত্যনির্ভর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নারীর অবস্থান’, বিকাশ ভৌমিকের ‘Women on Screen: Representing Women by Women in Bangladesh Cinema’ এবং জয়শ্রী সরকারের ‘মূলধারার চলচ্চিত্রে সহকারী নারী শিল্পীর (এক্সট্রা) আর্থ—সামাজিক অবস্থাঃ একটি তুলনামূলক চিত্র’।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক এবং ধর্মীয় চিন্তা ও মতাদর্শ প্রাধান্যশীল এই ডিসকোর্স নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে সমাজব্যবস্থায় পুরুষ ও নারীর ভূমিকা মোটাদাগে একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলে দেওয়া হয়। নারী পুরুষের কাজের ধরণ, তাদের পোশাক, তাদের আচরণ, কথা বলার রীতিনীতি সব কিছুই এই ডিসকোর্সের উপর ভর করে নির্মিত হয়। চলচ্চিত্র যেহেতু আর্থ—সামাজিক—রাজনৈতিক বাস্তবতারই এক বাস্তবসম্মত উপস্থাপন, তাই চলচ্চিত্রেও বিশেষত মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাধান্যশীল এই ডিসকোর্সেরই প্রতিফলন দেখা যায়। পর্দায় পুরুষ চরিত্র অনেক বেশি সক্রিয় আর নারীকে রাখা হয় নিস্ক্রিয় করে। চলচ্চিত্রে পুরুষের পেশাগত পরিচয় পাওয়া গেলেও খুব কম চলচ্চিত্রে নারীর পেশাগত পরিচয় পাওয়া যায়। এর পরিবর্তে নারীকে পাওয়া যায় প্রচলিত ডিসকোর্সে, নারীকে যেভাবে দেখতে অভ্যস্ত বা দেখাতে চায় — মাতা, কন্যা, বধূ, প্রেমিকা, ডাইনি, কূটনি এসব রূপে। অর্থাৎ নারীর চরিত্র উপস্থাপিত হয় পুরুষের সাথে সম্পর্কিত পরিচয়ের মধ্য দিয়ে। শেখ মাহমুদা সুলতানা (২০০২) বলছেন,
“These roles—child/woman. Whore, bitch, wife, mother, secretary or girlfriend, frigid career woman, vamp, etc were all portrayed falsely and one dimensionally.”
লরা মালভি তাঁর গবেষণায় হলিউডের মূলধারার বানিজ্যিক চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এসব চলচ্চিত্রে নারী কেবল দ্রষ্টব্য এবং পুরুষ তাকে গোপনে বা প্রকাশ্যে দেখে তৃপ্তি লাভ করে। আমাদের মূলধারার চলচ্চিত্রেও নারী কেবল দ্রষ্টব্য হিসেবে থাকেন। নায়কসর্বস্ব এসব চলচ্চিত্রে খলনায়কের থেকেও নায়িকার ভূমিকা গৌণ। সে কেবল দু—চারটে গানে এবং নায়কের সাথে রোমান্সে উপস্থাপিত হয়। সুলতানা (২০০২) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে,
“অশ্লীলতার দায়ে দুষ্ট ঢাকাই চলচ্চিত্রশিল্প নারীকে যথেচ্ছ ব্যবহার করার মধ্য দিয়েই তার ‘অশ্লীল’ পরিচয়টি অর্জন করেছে এবং যেখানে পুরুষ হলো ‘দানব’, ‘দেবতা’ ও ‘পতি’ এবং নারী হলো ‘নষ্টা’, ‘এক্সট্রা’ ও ‘সতী’।”
সক্রিয় চরিত্র হিসেবে পুরুষ কর্মঠ, মহান ও মহানুভব— এইরূপে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে জোরদার করার একটি প্রক্রিয়া। শুধু তাই নয় একটি বৃহৎ দর্শকের কাছে পোঁছানো এবং ব্যবসা সফলতার মধ্য দিয়ে পুঁজি তুলে আনার একটা ব্রক্ষ্মাস্ত্র। ফলে মূলধারার এসব চলচ্চিত্রে আধিপত্যবাদী পুরুষ চরিত্রায়নের বিপরীতে নারী ম্রিয়মাণ, গৌণ এবং প্রান্তিক মানুষে পরিণত হয়।
অন্যদিকে চলচ্চিত্রে মানুষের মানবিক সম্পর্কের মূল্যায়ন ব্যতীত কেবল একক সামজিক সত্তা হিসেবে নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। নারীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যৌনতা ও কামুকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাই চলচ্চিত্রে নারীর আবেদনময়ী রূপটিকেই যেন বারবার তুলে ধরা হয়। খান ফেরদৌস রহমান তাঁর এক গবেষনায় দেখিয়েছেন,
“চলচ্চিত্রের নগ্নতার সাথে যৌনতার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ, মূল ফ্রেমের কতটুকু অংশ জুড়ে নগ্নতা ও যৌনতার ইমেজ চিত্রিত করা হয় এবং কত সময় ধরে তা দর্শকের সম্মুখে প্রদর্শিত হয়⎯ তার ওপর নির্ভর করে উক্ত ইমেজ দর্শকের মনে। ফ্রেমের আকার—আয়তন এবং স্থিতিসময় সহ আবহ সংগীতের ওপরও এই ক্রিয়া—প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। চলচ্চিত্রের উৎপাদনের সাথে ভোক্তার গ্রহণ—বর্জনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিপুল বিনিয়োগ আর বিস্তর মুনাফার বিশেষ ধরনের জন্যই চলচ্চিত্রশিল্পের সাথে বরাবরই মাফিয়াসহ নানা ধরনের অবৈধ অর্থের প্রবেশ গোচরীভূত হয়েছে। আর এ জন্যই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে প্রথম থেকেই সেক্স—ফ্যান্টাসির উপস্থিতি চোখে পড়ে।” (রহমান, ২০১৪)
এমনকি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমাতেও মুক্তিযুদ্ধে নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভুমিকা পর্দায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত তো হয়নিই বরং নারীকে সেখানেও কেবল নির্যাতিতা আর ধর্ষিতা হিসেবে উপস্থিত করতে গিয়ে ধর্ষণকে বানিজ্যিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ধর্ষণের বিষয়টির মধ্য দিয়ে নারীর ‘সম্ভ্রম’, ‘সতীত্ব’ এই বিষয়গুলোতে প্রচলিত ডিসকোর্সে নারীকে দেখার প্রবণতাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীকে দেখতে অভ্যস্ত হয়েছে। কাবেরী গায়েন তাঁর গবেষণা গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন,
“কিন্তু নারী ধর্ষিত মানে যে সে অন্য কোন শারিরীকভাবে আক্রান্ত মানুষের চেয়ে আলাদা নয়— চেতনার এই জায়গাটি এখানেও অস্পষ্ট। ঘুরে ফিরে সর্বস্ব হারানোর বেদনাতেই ঘুরপাক খেতে হয়েছে নারী চরিত্রদের এবং এভাবে দর্শকদের। পুরুষতন্ত্র নির্মিত সতীত্বের যে রীতি ভেঙে বের হতে পারে নি আমাদের তৎকালীন সমাজ, সেটা ভেঙে বের হতে পারেন নি পরিচালক নিজেও।” (গায়েন, ২০১৩)
আবার কোন কোন চলচ্চিত্রে নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে বৈধকরণ প্রক্রিয়াও দেখিয়ে দেওয়া হয়। গীতিআরা নাসরিন ও ফাহমিদুল হক তাঁদের গবেষণায় ‘বিদ্রোহী সালাউদ্দিন’ (২০০৬) এবং ‘বাঘের বাচ্চা’ (২০০১) ছবি দুটিকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এ বিষয়টি। এমনকি নারীর সতীত্ব বা কুমারিত্ব নিয়ে প্রচলিত ডিসকোর্সটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা দেখা যায় এসব চলচ্চিত্রে। “নারীর কুমারিত্ব হলো প্রথম ও শেষ কথা, বিবাহবহির্ভূত কেউ তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে গেলেই তার সব শেষ, তার সবর্স্ব হরণ হয়ে গেল, সে ‘নষ্ট’ হয়ে গেল।” (নাসরীন, ২০০৮)। মূলত গতানুগতিক এইসব চলচ্চিত্রে নারীর এমন উপস্থাপন দুটি বিষষের সাথে সম্পর্কিত। প্রথমত, মুনাফা অর্জন। দ্বিতীয়ত, পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রবণতা।
তবে মূলধারার পুরুষ নির্মিত চলচ্চিত্রের বিপরীতে নারীর চোখে নারী বিষয়টি কিছুটা ব্যতিক্রম। বিশ্ব চলচ্চিত্রে মায়া ডেরেন, আনিয়েস ভার্দা, ভেরা খিতিলোভা, শান্তাল আকারম্যান, মার্গারেটা ভন ট্রটা, স্যাডি বেনিং, বারবারা হ্যামার, শার্লি ক্লার্ক, সামিরা মাখমালবাফ, অপর্ণা সেন, মীরা নায়ার, দীপা মেহতা প্রমুখ নারী নির্মাতার আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন বেশকিছু চলচ্চিত্রে নারীর যথার্থ চিত্র অংকনেও সমর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশের কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র এবং নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রেও নারী নির্মাতারা নারীর বাস্তবসম্মত জগত নির্মাণে অবদান রেখেছেন। এইসব চলচ্চিত্রে নারীর মনোজাগতিক, শরীরি উপস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে চিত্রিত হয়েছে, যেমনঃ শামীম আখতারের ‘সে’ (১৯৯৩), ‘ইতিহাস কন্যা’ (১৯৯৯), ‘শিলালিপি’ (২০০২); ফৌজিয়া খানের ‘I had something to say’ (২০০৬), ‘যে গল্পের শেষ নেই’ (২০১৩); শবনম ফেরদৌসীর ‘দীপ হাতে রমনী’ (২০১১), ‘জন্মসাথী’ (২০১৬); রুবাইয়াৎ হোসেনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ (২০১৫), ‘শিমু’ (২০১৯); নাসরিন সিরাজের ‘লুকোচুরি’ (২০১৯)। তবে মূলধারার বাইরের কতিপয় পুরুষ চলচ্চিত্র নির্মাতার চলচ্চিত্রে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ ও নারীর সংবেদনশীল উপস্থাপন লক্ষ করা যায়। যেমনঃ আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’ (১৯৭৫), মানজারে হাসীন মুরাদের ‘রোকেয়া’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’ (২০০৮) এবং সাম্পতিককালে নির্মিত এন. রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী কথা’ (২০২১)।
নারী চলচ্চিত্র নির্মাতার পটভূমি
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভাইদের হাত ধরে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করে। ঠিক তার পরের বছর ১৮৯৬ সালে আমরা প্রথম নারী নির্মাতাকে পাই, তিনি অ্যালিস—গী—ব্লাশ। নির্বাক চলচ্চিত্র ‘লা ফি অক্স চোক্স’ এর মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়। তারপর পৃথিবীর নানা দেশেই অনেক নারীই পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে এবং তাদের নিজ নিজ দেশে হয়েছেন নারী নির্মাতাদের পথিকৃত। সেই তালিকায় পাই আমেরিকায় লুইস ওয়েবার, আফ্রো—আমেরিকান ট্রেসিই সোওজারস; ভারতে ফাতেমা বেগম; ইতালিতে ইলভিয়া নোটারি; হংকং এ নিকোল গার্সিয়া; অস্ট্রেলিয়ায় গিলিয়ান আর্মস্ট্রং, নেপালে সুচিত্র শ্রেষ্ঠা প্রমুখ। (এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ওম্যান ইন টুডেস ওয়ার্ল্ড, ২০১১)
এ তালিকায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে প্রথম যার নাম আসে তিনি রেবেকা। ১৯৭০ সালে তাঁর চলচ্চিত্র ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। প্রসঙ্গত, চলচ্চিত্রটির কোন নেগেটিভ বা প্রিন্ট ভার্সন না থাকায় সে বিষয়ক আলোচনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
১৯৭০ থেকে ২০২২ এ দীর্ঘযাত্রায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে মূলধারা এবং স্বাধীনধারা মিলিয়ে বেশ কয়েকজন নারী নির্মাতা পাওয়া যায়ঃ রেবেকা, রোজী আফসারী, সুজাতা, কোহিনূর আক্তার সুচন্দা, শামীম আখতার, ক্যাথরিন মাসুদ, নার্গিস আখতার, মৌসুমী, সারাহ বেগম কবরী, ফৌজিয়া খান, সামিয়া জামান, শবনম ফেরদৌসি, রুবাইয়াৎ হোসেন, শাহনেওয়াজ কাকলী, নাজনীন হাসান চুমকি, মেহের আফরোজ শাওন, তানিয়া আহমেদ, চয়নিকা চৌধুরী, সৈয়দা নিগার বানু, হুমায়রা বিলকিস, সেঁজুতি সুবর্ণা টুসি, তাসমিয়াহ আফরিন মৌ, আসমা বীথি, দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন, এলিজাবেথ ডি কস্টা, রাওয়ান সায়েমা, অপরাজিতা সঙ্গীতা, জুয়েইরিযাহ মৌ, ঝুমুর আসমা জুঁই, জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা, লাবনী আশরাফি প্রমুখ।
যদিও এর কোন ধারাই নারীবান্ধব নয়। কেননা বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বা বাস্তবতা কোনটাই নারীর জন্য অনুকূল নয়। আমরা এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্রে নারীর স্বরূপ নিয়ে কথা বলছি যখন বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর স্বাধীন চলাফেরা, পোশাক পরিধেয় নিয়ে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সম্প্রতি নরসিংদীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের দিকে চোখ দিলেই আমরা বুঝতে পারি। পিতৃতন্ত্রের সাপেক্ষে নারীর জন্য যে সীমারেখা টেনে দেওয়া হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে তার উপস্থাপন আমরা চলচ্চিত্রেও দেখতে পাবো। কেননা নারী তার যাপিত জীবনের ব্যঞ্জনাকেই তার কাজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরবেন। বাংলাদেশের আর্থ—সামাজিক—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নারীর উপস্থাপন বিষয়ক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এ যাবতকালে চলচ্চিত্রে নারীর অংশগ্রহণের লৈঙ্গিক—সামাজিক—রাজনৈতিকভাবে অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিত যথার্থ ও সামগ্রিকভাবে চিত্রিত হয়নি বরং নারীকে মূল্যায়ন করা হয়েছে পুরুষ নির্মাতা তাকে কীভাবে চলচ্চিত্রে নির্মাণ করেছেন তারই রসদ হিসেবে। এই প্রেক্ষিতে আমরা মূলত নারী নির্মাতা কীভাবে নারীর জগতকে উন্মোচন করেছেন সে বিষয়ে আলোকপাত করবো। কেস স্টাডি হিসেবে মূলত তিনজন নারী নির্মাতা — শামীম আখতার, নার্গিস আকতার এবং ফৌজিয়া খানের তিনটি চলচ্চিত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র এবং মূলধারার চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপন বিষয়ক আলোচনা প্রাধান্য পাবে।
নারীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ পাঠ: ইতিহাস কন্যা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি কাজ করেছেন, তিনি শামীম আখতার। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও তিনি একাধারে সাংবাদিক, লেখক এবং চলচ্চিত্র সংসদকর্মী। ১৯৯১ সালে তারেক মাসুদের সাথে যৌথভাবে নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সে’। পরবর্তীতে নির্মাণ করেন ‘ইতিহাস কন্যা’ (১৯৯৯), ‘শিলালিপি’ (২০০২), ‘রীনা ব্রাউন’ (২০১৫) সহ ২০টিরও অধিক প্রামাণ্যচিত্র। আমরা তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘ইতিহাস কন্যা’ (১৯৯৯) বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নারীর উপস্থাপন অনুসন্ধান করবো।
‘ইতিহাস কন্যা’য় মূলত উনিশশো একাত্তরে সংঘটিত নারী নির্যাতন এবং যুদ্ধশিশুর প্রসঙ্গটি চিত্রায়িত হয়েছে। এযাবতকালের মূলধারার চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের নারী নির্যাতনের যে দৃশ্যায়ন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চিত্রায়িত হয়েছে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারীর অন্তর্বেদনাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। প্রচলিত গল্প বলার যে কাঠামো তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে আমরা এই প্রথম নারীর দৃষ্টিতে নারীর যুদ্ধ দেখতে পাই। মোট ৬ জন নারীর মধ্য দিয়ে নয় মাসের যুদ্ধের বিশাল ক্যানভাস ও যুদ্ধপরবর্তী দ্বন্দ্বগুলোকে বিনির্মাণ করেছেন তিনি। মনিকা একজন এক্টিভিস্ট যিনি জেনোসাইড নিয়ে কাজ করছেন, অনন্যা (তার বড় বোনের মেয়ে), রূপা তার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। কনক এক রহস্যাবৃত চরিত্র হিসেবে মনিকার দিদি আর অনন্যার খালা হিসেবে মনিকাদের সাথে বাস করে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে লালারুখ নাম্নী একজনের আগমন ঘটে যিনি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জানতে চান, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সাথে কথা বলতে চান। পুরো চলচ্চিত্রে আমরা দুজন পুরুষের দেখা পাই। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে শামীম আখতার নির্মাণ করেন এক ‘women’s world’।
“শামীম আখতার অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন থেকেই ‘ইতিহাস কন্যা’ নির্মাণ করেছেন। অতীত বলতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শামীমের উৎসাহ এই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবস্থা ও অবস্থান বিচার। শামীমের বক্তব্য ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে যোদ্ধার শৌর্য—বীর্য—সাফল্যই চিত্রায়িত হয়। কেবল নারীর অনুপস্থিতি সেক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রকট। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকাকে সনাক্ত করতে চাইলে ইতিহাসে ভিন্নপাঠ অনিবার্য। নারীবাদী চৈতন্যে ইতিহাসের পাঠ—প্রচেষ্টায় বানানো হয়েছে মৃত্তিকা প্রোডাকশনের ‘ইতিহাস কন্যা’। ছবিটিতে একটি পরিবারের দহন যন্ত্রণা, বিপর্যস্ততা, বিচ্ছিন্নতা অনুচ্চারিত ইতিহাসের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস চর্চার বাইরে এর কাহিনী নারী চৈতন্যের পাঠ।” (আউয়াল, ২০০৪)
চলচ্চিত্রের কাহিনীর মধ্য দিয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ঃ মনিকার রাজনৈতিক অবস্থান, ক্ষোভ ও বেদনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। অনন্যার আত্মপরিচয় উদঘাটন, ‘যুদ্ধশিশু’ শব্দটি তার মনোবল ভেঙে দিতে পারেনা। লালারুখের চিঠির মধ্য দিয়ে নির্মাতার আশাবাদীতার প্রকাশ — যে একদিন পাকিস্তান ক্ষমা চাইবে। সর্বশেষ, নারীর যুদ্ধ ইতিহাস।
চলচ্চিত্রের শুরুতেই ১০ মিনিট সময়কালের একটি গানের দৃশ্যায়নে বর্তমান আর অতীতের যুগপৎ চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে নির্মাতা তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিয়ে দেন। কাহিনীচিত্রের গতানুগতিক যে প্রবণতা— সবটাই কৃত্তিম বাস্তবতা, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বরং প্রামাণ্যকরণের আশ্রয় নিয়েছেন নির্মাতা। ঢাকার সকাল, কর্মব্যস্ততা এসব ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বাস্তবতাকে ধারণ করার প্রবণতা আছে, অন্যদিকে আছে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বয়ে লুকোনো স্বাভাবিকত্ব — ‘চলছো জীবন, জীবনমেলায়’। টুকরো টুকরো কোলাজের বিন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবনে বিশেষত শ্রমিকশ্রেণীর দেখা পাওয়া যায়, একইসাথে চলচ্চিত্র যে নারীদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে তাদের প্রস্তুতিও লক্ষ্য করা যায়।
আখ্যানের শুরুতেই দেখতে পাই মাত্র এক সপ্তাহের জন্য লালারুখ এসেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে। তার উত্তরে মনিকার গলায় আমরা একইসাথে শ্লেষ ও ক্ষোভের স্বর পাই — “এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি নয় মাসের ক্ষয়ক্ষতি কাভার করবে!” অর্থাৎ ক্ষতটা গভীর, অনেকদিনের, কেবল একটি দুটি রিপোর্ট সেমিনারে তার নাশ নাই। মনিকা বিয়ে করেনি। তার গম্ভীর মুখের রেখায় চলচ্চিত্রের মধ্যে নারীর যুদ্ধের যে গভীর ক্ষত তা প্রতীকায়িত হয়। তবে তা দুর্বল নয়, বরং প্রতিবাদমুখর, দৃঢ়। অনন্যা যখন বলে— “হয়তো বিয়েটা ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। ওর কাজটাই ওর সঙ্গী”, কিংবা বাবা যখন বলে, “এ বাড়িতে যা কিছু হয় তা তো তোমার হুকুমেই হয়” — এ থেকে মনিকার ব্যক্তিত্ব বোঝা যায়। বেটি ফ্রাইডেন যেভাবে বলেন, নারীর যাপিত জীবনে ঘরের বাইরে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতায়ন ঘটে এবং প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মনিকার রাজনৈতিক সচেতনতা একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ডিসকোর্সগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
মনিকার বয়ানে ’৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ক্ষোভের সাথে প্রকাশিত হতে দেখা যায়, তা মূলত নির্মাতারই নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান —
— “স্বাধীনতার পরে মধ্যবিত্ত আর এলিটরা ভাবলো তারা সব পেয়ে যাবে। এই নতুন শ্রেণীটাই লাভবান হলো। ফুলে ফেঁপে উঠলো। নতুন একটা শ্রেণী, নতুন টাকা। এই নতুন এডুকেটেড জ্ঞানপাপী শ্রেণীটাই হলো সমস্যা। যারা জেনেও জানেনা, জানতে চায়না। এই শ্রেণীটা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝেনা। পাকিস্তান যে এত বড় অপরাধ করে গেল, সেটা তারা ভুলে যেতে চায়। এরা পাকিস্তানিদের চাইতেও বেশি পাকিস্তানি।”
— “আর মানুষ তো ভুলে গেছে এখনো রক্ত কোথায় ঝড়ছে।” (বীরাঙ্গনা প্রসঙ্গে)
— “তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু শৌর্য বীর্য আর সাহসিকতার গাঁথা না। ধর্ষণ, গণহত্যা এগুলোর পাশাপাশি বড় সত্য। সাহসিকতার সব গল্পের নিচে এগুলো, ক্ষয়ক্ষতির গল্পগুলো ঢাকা পরে যায়।”
মনিকা সামাজিক উন্নয়নকে খোঁচা দিতে ছাড়েনা। যে সত্য আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও সত্য। কেননা মননের চিন্তার উন্নতি না ঘটলে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটা জাতিকে মুক্তি দিতে পারেনা। নারী সেখানে বারবার ধর্ষিত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত হয়। এটাই সত্য। ‘ইতিহাস কন্যা’ (১৯৯৯) সেই সত্যের কথা বলে যায়।
আঙ্গিকের ক্ষেত্রে নির্মাতা মনিকা ও লালারুখের মনোলগের মধ্য দিয়ে, পর্দায় তাদের নিশ্চুপ উপস্থিতি, গম্ভীর মুখের রেখার মধ্য দিয়ে সেই অদেখা যুদ্ধের ভারকে নতুন প্রজন্মের কাছে সমব্যথায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে যে বিষয়টি সমাজ থেকে শুরু করে পরিবার চেপে যেতে চায়, সেই বীরাঙ্গনা অধ্যায়টিকে নির্মাতা সযত্নে সোচ্চারে তুলে ধরেন কনক ও কনিকা চরিত্র দুটির মধ্য দিয়ে। ধর্ষণের নির্মমতাকে কোথাও সরাসরি দৃশ্যায়িত না করেও কনক ও কনিকাদের ব্যথা আমাদেরকে স্পর্শ করে যায়। একইসাথে গণহত্যার বিষয়টিকেও সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে কোথাও কোন গ্রেনেড বিষ্ফোরণের শব্দ নেই, প্রকাশ্য খুনের দৃশ্য নেই। বরং কতগুলি সাক্ষাৎকার, বর্ণনা, তথ্য ও নিদর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি অকপট বলে গেছেন। কাহিনীচিত্রের শরীরে প্রামাণ্যচিত্রের মিশেলে এই চলচ্চিত্রের আঙ্গিককে অনন্য করেছেন।
এই চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধশিশু। অনন্যা চরিত্রটির মধ্য দিয়ে বিষয়টি কাহিনীতে জুড়ে দিয়েছেন নির্মাতা। চলচ্চিত্রটি ক্লাইমেক্সে গিয়ে অনন্যা জানতে পারে নিজের আত্মপরিচয়। জানতে পারে তার মা কনিকা একাত্তরের বর্বর পাকবাহিনী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং তাকে জন্ম দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কনিকার সাথে সাথে আমরা কনকের পরিচয় পাই। সে এক হিন্দু বাড়ির মেয়ে। তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে তাকে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। কনিকা ও কনক একইসাথে ফিরে আসে। কনিকা আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে তার যুদ্ধটা শেষ করে আর কনকের নীরব যুদ্ধ চলতে থাকে। ক্লাইমেক্সের এ পর্যায়ে এসে আমরা দুই প্রজন্মের মধ্যে চিন্তাগত ফারাকও দেখতে পাই। বাবার কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয় কেননা সে তার কন্যাকে কোনদিন ফিরে পাবেনা। কিন্তু মনিকা, মানস ওরা চায় ‘পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে’। মনিকা বলে–
— “ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বাবাদের জেনারেশনের সাথে আমি মোটেও একমত না।”
কেননা পাকিস্তান সরকারের ক্ষমা চাওয়া মানেই হচ্ছে যুদ্ধে যে তারা গণহত্যা করেছে সেটা স্বীকার করা। মনিকার চাওয়া মূলত নির্মাতা শামীম আখতারের আদর্শিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। গণহত্যা, ধর্ষণ, যুদ্ধশিশু বিষয়ক এই নিবিঢ় পাঠ তা নারীর চোখ দিয়ে অনুধাবন করার ফলেই সম্ভব। যুদ্ধের নারী মনস্তত্ব পাঠের সুযোগ করে দিয়েছেন নির্মাতা। এবং তার উচ্চারণও দৃঢ় পরিষ্কার —
— “লাঞ্ছিতা শ্যামলী বাংলার বোবা কালা আজ বলতে চায় আর কখনো গণহত্যা নয়।”
সর্বশেষ অনন্যার চিঠিতে যুদ্ধের এত বছর পরেও যেন নতুনভাবে দায়বোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রের শেষ পর্যায়ে ঋত্বিক ঘটকের সেই অদেখা চাবুকের বাড়ি যেন আমাদের সবার পিঠে লাগে। যখন অনন্যা বলে —
— “কী নৈর্ব্যক্তিক নিষ্ঠুর একটা সমাজ। এর মধ্যে আমি কীভাবে বেঁচে থাকবো বলতে পারো? কী পরিচয়ে?”
অর্থাৎ নারীর যুদ্ধটা শেষ হয়ে যায়নি। নারীর ক্ষতবিক্ষত হওয়ার ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি। তবুও অনন্যা তার নামের মান রেখেছে সে অনন্য হয়ে উঠেছে আপন শক্তিতে, ব্যক্তিত্বে, স্বাধীনতায়; যুদ্ধশিশুর পরিচয় জেনেও তার মনোবল এতটুকু ভাঙেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর এমন রূপ কেবল একজন নারীর অনুভবের মধ্য দিয়েই দেখা সম্ভব।
“‘ইতিহাস কন্যা’ কল্পিত চরিত্রের কাঠামোর আড়ালে সুগভীর মানবিকতাবোধ ও একই সাথে বর্বরতার দালিলিক চলচ্চিত্র। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা ও ধর্ষণের ঘটনাকে নির্মাতাকে সাক্ষাৎকার, বর্ণনা, কথকতা, তথ্য ও নিদর্শনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রিক ভাষায় তুলে ধরেছেন। চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ত্যাগ ও বেদনা আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এতে কোন যুদ্ধ নেই, গোলাগুলি নেই, শ্লোগান নেই, গ্রেনেডের বিস্ফোরণ নেই, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের কোন দৃশ্য নেই, অথচ চলচ্চিত্রটির প্রতিটি ফ্রেমে, চিত্রে, শব্দে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি ও উপস্থিতি। ছবিতে পাকিস্তানী লালারুখের প্রতি নানার উচ্চারণ ‘তোমার মেয়েকে কেউ ধর্ষণ করলে তুমি কি পারবে তাকে ক্ষমা করতে?’ সমস্ত বোধ ও অনুভূতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। শামীমের কাছে মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিজয়ের গৌরব গাঁথা নয়, গণহত্যা ও ধর্ষণেরও। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইতিহাস কন্যা’ মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দালিলিক চলচ্চিত্র।” (হায়াৎ, ২০১১)
নারীর শরীর ও সত্তার পাঠ: যে গল্পের শেষ নেই
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংষ্কৃতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষনীয় তা হলো কাহিনীচিত্র থেকে প্রামাণ্যচিত্রে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। কাহিনীচিত্র নির্মাণে যে বিশাল ও জটিল প্রক্রিয়া সেখানে নারী তার যোগ্যতা প্রমাণে অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ পান। এবং কাহিনীচিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াটি একটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোরই নামান্তর। এর বিপরীতে নারী প্রামাণ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে তার নিজস্ব কথা বলে যাওয়ার সুযোগ পান বেশি। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ক্যামেরার সহজলভ্যতাও এর একটি কারণ হতে পারে। আমাদের এ পর্যায়ের আলোচনা মূলত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে। ফৌজিয়া খানের ‘যে গল্পের শেষ নেই’ (২০১৩) প্রামাণ্যচিত্রটি আমাদের প্রধান আধেয়। ফৌজিয়া খান একজন স্বাধীনধারার প্রামাণ্যকার, সেই সাথে একজন সম্পাদক, লেখক এবং চলচ্চিত্র শিক্ষকতায় যুক্ত আছেন।
ফৌজিয়া খান নির্মিত ‘যে গল্পের শেষ নেই’ (২০১৩) প্রামাণ্যচিত্রটির বিষয় হলো নারীর শরীর সম্বন্ধীয় একান্ত পাঠ। নারীর যৌনতা বিষয়ক পাঠ সাধারণভাবে আমাদের সমাজে একটি অনুচ্চারিত, অনুচ্চকিত বিষয়। কিন্তু প্রামাণ্যকার নিজে একজন নারী হওয়ার দরুণ এ যেন তার নিজস্ব নারীজীবন বিষয়ক অভিজ্ঞানের অনুসন্ধান। এই প্রামাণ্যচিত্র নারীর সত্তা সম্বন্ধীয় ও নিজস্ব অস্তিত্বের প্রশ্নে একটি ভীষণ রাজনৈতিক পাঠ। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর যৌনতা বিষয়ক আলাপ নিজেই একটি রাজনৈতিক অবস্থান নেয়।
উৎসর্গ
‘আমাদের
আমরা যারা
পৃথিবীকে
প্রাণ দিচ্ছি
শরীরের ভেতর থেকে’
আমরা এমন এক পৃথিবীতে আছি
যেখানে ভালোবাসতে লুকোতে হয় আমাদের
অথচ সূর্যের প্রখর আলোয় চলছে
মারামারি হানাহানি।
জন লেনন
এভাবেই শুরু হয় ‘যে গল্পের শেষ নেই’ (২০১৩) প্রামাণ্যচিত্রটি। প্রামাণ্যকার দুটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করে দেন — একদিকে নারীর অন্তর্নিহিত সৃজনীশক্তি, পৃথিবীর প্রাণের উৎস অনুসন্ধানের তাগিদ, অন্যদিকে আড়াল বা লুকানোর প্রবণতা। জন লেননের কবিতার সূত্র ধরে ভালোবাসার অবদমনের প্রতীকি ভাষা নির্মাণ।
ওপেনিং সিকোয়েন্সে — নারীর যৌন সত্তার এক কাব্যিক প্রকাশ দেখতে পাই। একদিকে প্রাচীণ ভাষ্কর্যগুলো তুলে ধরছে নারীর যৌনতার অবজেক্টিফাইড রূপ। আর তার সাথে প্রামাণ্যকার প্রকৃতির মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে নারীর শরীরকে একটু একটু করে পূর্ণতা দিচ্ছেন। নারীর শীৎকারধ্বণি আর বৃষ্টির শব্দ মিলে নারী হিসেবে আমাদের নিজেদের শরীর ছুঁয়ে দেখার এক অসম্ভব সাহস তৈরী হয় মনের ভেতর। বলে— এইতো আমি। এই সাহসই বোধহয় ট্যাবু ভাঙার সাহস। সেই শব্দ ছাপিয়ে এক বৃদ্ধার যৌনতা বিষয়ক উচ্ছলতার, লাজুকতার শব্দকল্প শুনতে পাই আমরা। যে থাকে দৃষ্টির আড়ালে কিন্তু যে যৌনতার আনন্দকে দর্শকের মাঝে প্রবাহিত করে দেয়। এই পুরো দৃশ্যকল্প চোখ বন্ধ করে অনুভব করা যায়। এই দৃশ্যেই আমার দেখতে পাই আড়াল বিষয়ক মোটিফের ব্যবহার, তা হলো— শাড়ি। শাড়ির প্রতীকে তিনি নারীর না বলা অনেক গল্পই বলে যান অগোচরে। আর দর্শককে একটি পথ করে দেন এই প্রামাণ্যচিত্রের যাত্রায়।
এরপর হুমায়ুন আজাদের কবিতার সূত্রে আসে নারীর ‘মা’ পরিচয়ের স্বরূপ। আসে বাবা—মায়ের সম্পর্কের এক ঝলক— “আমি জানিনা মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কিনা।” আমাদের সামনের বাবার অবয়ব তৈরী হয়। সেই সাথে লাল কাতান শাড়ি আর সানাইয়ের সুর মিলিয়ে প্রামাণ্যকার বাবা—মায়ের সম্পর্কের সূত্রপাতের ইতিকথা তুলে ধরেন। বিয়ে ও নারীর মধ্যকার কনোটেশন এভাবেই প্রতীকায়িত করেন তিনি। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত যৌন কাঠামোতে নারী কেবল দূরের পৃথিবীর কেউ। পুরুষের ফ্যান্টাসিই সেখানে প্রধান, যা কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রের মধ্য দিয়ে নারীর পণ্যায়িত রূপটি তুলে ধরেন।
এরপর ক্যামেরা চলতে শুরু করে নির্মাতা স্থিরচিত্র থেকে চলমান চিত্রের মধ্য দিয়ে মেনজ ওয়ার্ল্ডে নিয়ে যান। নাগরিক ছবি দেখতে পাই। এরপর নগর পেরিয়ে পাই গ্রাম, আর সেখানেই দেখা পাওয়া যায় ৬৫ বছরের আয়েশা আক্তার এবং শুক্লা কুন্ডুর। এই প্রামাণ্যচিত্র খুব সচেতনভাবে নগর আর প্রান্তের দুটি ভিন্ন পাঠকেই গুরুত্বের সাথে তুলে এনেছে। যৌনতা সম্পর্কে এ পাঠ অপেক্ষাকৃত জটিল একটি প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে প্রামাণ্যকার ছিলেন সংবেদনশীল। তিনি প্রতীকের ব্যঞ্জনায় নারীর জীবনের আড়ালের আখ্যান নারীর জীবনের ব্যবহৃত দৈনন্দিন অনুষঙ্গের মধ্য দিয়েই বলতে চেয়েছেন যা প্রামাণ্যচিত্রটিকে কাব্যিকতায় উত্তীর্ণ করেছে।
প্রান্তিক নারীর বয়ান থেকে আমরা প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক ডিসকোর্সটিকেই পেয়েছি। সেখানে পুরুষের ইচ্ছেই শেষ কথা এ বিষয়টি উঠে আসলেও যৌনতা বিষয়ক প্রান্তিক নারীর অংশগ্রহণ এ প্রামাণ্যচিত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এ পর্যায়ে একটি চিত্রকল্প ভীষণ ব্যাঞ্জনাময়, তা হলো— মাটির দেয়ালের ক্ষয়িষ্ণু মোটিফ নারীর জীবনের বলা না বলা স্বরের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে যেন।
এই প্রামাণ্যচিত্রের শহুরে শিক্ষিত নারীর কন্ঠস্বর প্রান্তিক নারীদের তুলনায় স্পষ্ট এবং দৃপ্ত। এটির পেছনে তাদের অবস্থানগত কারণ এবং নাগরিক পরিসর, শিক্ষা প্রভূত ভূমিকা রেখেছে। তবুও যেন ছিল রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ। তাদের মুখে শৈশব থেকে শরীর চেনার গল্প শুনতে পাই। নারীর শরীর চেনার প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। সেখানে থাকে ভয়, লজ্জা আর গ্রহণের দ্বিধা। এই দ্বিধা সমাজ আরোপিত। নারীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংষ্কার, বিধি আর প্রথার দ্বিধা।
শিকোয়া নাজনীন আরো যুক্ত করেন দাম্পত্য জীবনের নতুনত্ব, পরিবর্তন, মানিয়ে নেওয়ার বা পার্টনারের সংবেদনশীলতার গল্প। অন্যদিকে নাসরিন সিরাজ অ্যানির কন্ঠে আমরা নারী জীবন উদযাপনের গল্প শুনতে পাই। কৈশোর থেকে নারীত্বে পদার্পণের আনন্দ। এমনকি তার শরীরি উপস্থাপন ও প্রকাশভঙ্গির সাবলীলতাও সেই আনন্দের প্রকাশ ঘটিয়েছে। নেপথ্যে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনা যায় — ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি’ — যা সেই উদযাপনকে দ্বিগুণ করে দেয়। নিজের শরীরকে দেখার, ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে শরীর ও মনের যুগপৎ মিলনেই আসে প্রেম—কাম, প্রামাণ্যকার এ বার্তা তুলে দেন দর্শকের কাছে।
অন্য এক নারী — হৃদিতা তাসনিমের বয়ান থেকে নারী পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের এক সুখী দাম্পত্যজীবনের ছবি পাই। হৃদিতার বয়ান থেকে উঠে আসে সন্তান জন্মদান এবং যৌনতা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। এবং সর্বশেষে নাট্যজন ঋতু সাত্তারের কাছ থেকে মাতৃত্বের বোধ সম্পর্কিত অভিজ্ঞান শুনতে পাই। উৎসর্গ পত্রে প্রামাণ্যকার বলেছিলেন শরীরের ভেতর থেকে প্রাণ প্রতিষ্ঠার কথা। ঋতু সাত্তারের আলাপের মধ্য দিয়ে মানবশিশুর ক্রমবিকাশ এবং প্রাণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই উঠে আসে। একই সাথে মাতৃত্বজনিত কারণে যে শরীরি পরিবর্তন সে বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে তার আলাপে।
‘যে গল্পের শেষ নেই’ (২০১৩) প্রামাণ্যচিত্রের বিষয় নারীর শরীর বিষয়ক পাঠ। একটি ট্যাবু বিষয়কে প্রামাণ্যকার যে আঙ্গিকে তুলে এনেছেন সেটির জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। গীতিকবিতার মতোই ৫৪ মিনিট জুড়ে প্রত্যেক নারীই যেন তার আত্মজ অনুভবের ব্যঞ্জনা ব্যক্ত করেছেন। পর্দা জুড়ে থেকেছে প্রতীক চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাতভর বৃষ্টি’র অংশবিশেষ দিয়ে তিনি প্রতিটি এপিসোড ভাগ করেছেন। শব্দকল্পে নারী তার শরীর নিয়ে কথা বলছে আর দৃশ্যকল্পে নদীর রূপকল্প — সব মিলিয়ে লুকিয়ে রাখা, অব্যক্ত একটি বিষয়কে তিনি অবলীলায় ব্যক্ত করে দিলেন। প্রামাণ্যচিত্রটি শেষ করেছেন নর—নারীর প্রেমের এক গূঢ় উচ্চারণ দিয়ে — ‘তোমার পাখনায় আমার পালক, / আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দনৃ আমি যদি হতাম বনহংস,/ বনহংসী হতে যদি তুমি।’
নারীর সমতায়ন ও ক্ষমতায়নের রাজনীতিতে নারীর শরীরি অভিব্যক্তি তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রকাশের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ আর প্রামাণ্যকার ফৌজিয়া খান সেই কাজটিই করেছেন এক কাব্যিক গীতিময়তার মধ্য দিয়ে।
বাণিজ্যিক ছবিতে নারীর স্বরূপ: মেঘের কোলে রোদ
মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির অঙ্গনে বলা যায় একমাত্র নারী নির্মাতা নার্গিস আকতার। তিনি এই ধারায় ৭টি ছবি নির্মাণ করেছেন। ২০০১ সালে ‘মেঘলা আকাশ’ ছবির মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। এছাড়া নির্মাণ করেছেন সেলিনা হোসেনের গল্প অবলম্বনে ‘চার সতীনের ঘর’ (২০০৫), ‘মেঘের কোলে রোদ’ (২০০৮), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাপ্তি গল্প অবলম্বনে ‘অবুঝ বউ’ (২০১০), এবং সর্বশেষ সেলিম আল দীনের নাটক অবলম্বনে ‘যৌবতী কন্যার মন’ (২০২১)। আমরা মূলত ‘মেঘের কোলে রোদ’ ছবিটিতে নারীর উপস্থাপন নিয়ে আলোচনা করবো। বিশেষত মূলধারার ছবিতে নারীর চরিত্র রূপায়নের ক্ষেত্রে একজন নারী নির্মাতার দৃষ্টিকোণকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
২০০৮ সালে নির্মিত ‘মেঘের কোলে রোদ’ ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন নারগিস আকতার। ছবিটির কাহিনীবৃত্তে আছে ত্রিভুজ প্রেমের গল্প এবং সেই সাথে এইডস বিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা। ন্যারেটোলজির উপাদান কাহিনী, বক্তব্য এবং আঙ্গিক — এর মধ্য দিয়ে আমরা ছবিটিকে বিশ্লেষণ করবো।
প্রথমেই আসা যাক ছবিটির কাহিনীতে। কাহিনীর পটভূমি মালয়েশিয়া। দুজন বাংলাদেশি ছেলে—মেয়ে নিঝুম ও রোদেলা মালয়েশিয়ায় লেখাপড়া শেষ করেই আবার ছয় মাসের একটি বিশেষ কোর্সের সুযোগ পায়। বাড়িভাড়ার সমস্যার সম্মুখীন হলে বাংলাদেশি এক নারীর সাথে পরিচয় হয় এবং তার বাসাতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে আশ্রয় নেয়। নিঝুমের বন্ধু উদয় লন্ডন থেকে আইনি পড়াশোনা শেষ করে বন্ধুর এখানে বেড়াতে আসে। উদয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো তার ভাষ্যমতে ‘সে মেয়ে পটাতে ওস্তাদ’, যদিও রোদেলার এসব একদম পছন্দ নয়। এরপর ওরা তিনজন মিলে পেনাং এ উদয়ের মামার কাছে বেড়াতে যায়। পেনাং এসে পিতৃমাতৃহীন উদয়ের প্রেমে পরে যায় রোদেলা। উদ্ভব হয় ত্রিকোণ প্রেমের। রোদেলা উদয়কে ভালোবাসে, নিঝুম ভালোবাসে রোদেলাকে আর উদয় তার বন্ধুত্বের প্রতিদানে রোদেলাকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর রোদেলা দেশে ফিরে আসে এবং নিঝুমকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের রাত থেকেই কাহিনী নতুন দিকে মোড় নেয়। সামনে আসে এইডসের বিষয়টি। রোদেলার বাবা—মায়ের সূত্র ধরে রোদেলার এইডসের সম্ভাবনা নিয়ে বিয়ের রাতেই ডিভোর্সের প্রসঙ্গ উঠে আসে। রোদেলা ফিরে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা করে এবং রোদেলার হয়ে আইনি লড়াই করে উদয়। মামলায় রোদেলা জয়ী হয় এবং শেষ পর্যন্ত সে রোদের আলো সংগঠনের মধ্য দিয়ে নারীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
পরিচালক সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ফরম্যাটের আওতায় গ্ল্্যামার, নাচ—গান এমনকি মারপিটের দৃশ্য সংযোজনর মধ্য দিয়ে ছবিটি সম্পন্ন করেছেন।
এই ছবির কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র রোদেলা। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি রোদেলা নিঝুম মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কিত কোন একটি বিষয়ে পড়াশোনা করছে। তারা দুজন যখন ৬ মাসের কোর্সের জন্য মালয়েশিয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন আবাসন সমস্যা মেটানোর জন্য ‘লিভ টুগেদার’ এর প্রসঙ্গ আসে। নিঝুম বিষয়টি রোদেলাকে বোঝাতে গেলে রোদেলার জবাব আসে —
রোদেলা: তোর আমার মধ্যে ছেলে—মেয়ের পার্থক্য হচ্ছে কেন? তুই আমার ফ্রেন্ড।
নিঝুম: তুই বুঝছিসনা।
রোদেলা: দ্যাখ নিঝুম, ওসব ব্যাখ্যা যারা তৈরী করেছে ওটা তাদের জন্য থাক। আমরা চলবো আমাদের ব্যাখ্যায়।
কিন্তু রোদেলার এই সক্রিয়তা খুব বেশিক্ষণ আমরা ছবিতে দেখিনা। উদয়ের আগমনের মধ্য দিয়ে সে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হতে থাকে। অন্যদিকে বাড়িওয়ালী চরিত্রে দিতিকে পাই। যার ভাষ্যমতে সে একজন ডাক্তার কিন্তু পুরো ছবিতে তার পেশাগত জীবনের কোন সক্রিয় কার্যক্রম নেই বরং তার প্রেমিক পুরুষটি এবং স্বামী পুরুষটির মধ্যেই জীবন চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। পরিচালক অবশ্য এই চরিত্রটিকে খুব বেশি বিকশিত করেননি। তার মুখ দিয়ে শুনি— “বাংলাদেশের সামাজিক নিয়ম কানুন সংষ্কৃতি মেনে চলতে পারবে তো?” এই কথার মধ্য দিয়ে তিনি নারী আর পুরুষের ভেদরেখাটি টেনে দেন, কেননা তিনি জানেন ওরা স্বামী— স্ত্রী নয়।
মালভি বলেন, “নারীকে এভাবে পিতৃতান্ত্রিক সংষ্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে, প্রতীকি শাসন দ্বারা বেষ্টিত হয়ে, অন্য পুরুষের দ্যোতক হিসেবে পরিচিত হতে হয়। আর এভাবে ভাষিক দখলের মাধ্যমে পুরুষ তার ফ্যান্টাসি আর আবিষ্টতার মধ্যে বাস করতে পারে, নারীর নিরব ইমেজের ওপর ফ্যান্টাসি ও আবিষ্টসমূহকে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।” (হক, ২০০৭)
রোদেলা চরিত্রটি পুরুষতান্ত্রিক ঘেরাটোপের বাইরে বেরোতে পারেনা বা সেভাবে পর্দায় তার উপস্থিতি আমরা পাইনা। দুজন পুরুষের সাপেক্ষে রোদেলার চরিত্রটি বিকশিত হয়। বিশেষত উদয় চরিত্রটির প্রথমার্ধ হলো বখাটে লম্পট চরিত্রের প্রতীরূপ, যে মেয়েদের উত্যক্ত করে। পিতৃমাতৃহীন উদয় জীবনকে উপভোগ করার কথা বলে। আর তার উপভোগ করার একমাত্র উপাদান হলো নারীকে প্রেম নিবেদন করা, উত্যক্ত করা। এমন একজন পুরুষের মাধ্যমে রোদেলা নিজেকে আবিষ্কার করে। মূলত পুরুষের নিয়ন্ত্রণ করবার যে নীরব প্রক্রিয়া, সেটাই যেন নির্মাতা উদয় চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন। শিক্ষিত নারী রোদেলা অনায়াসে এই পুরুষকে বলে, “He is great, really great”। একদল গুন্ডাবাহিনী থেকে উদয় রোদেলাকে উদ্ধার করে। মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতে নারীকে যে দ্রষ্টব্য করে তোলার প্রবণতা, নিষ্ক্রিয় এবং পুরুষের উপর নির্ভর করে থাকার অভ্যস্ততা তাকেই বিনির্মাণ করেছেন নার্গিস আকতার।
যে পুরুষ উত্যক্তকারী সেই পুরুষ অন্য বখাটের হাত থেকে নারীকে উদ্ধার করলে নায়িকা প্রশ্ন করে —
রোদেলা: কেন তুমি এমন করলে?
উদয়: তোমাকে কেউ বিরক্ত করবে আর আমি চুপ করে থাকবো?
রোদেলা: তুমিও তো কত মেয়েকে করো!
উদয়: (অকপট স্বীকারোক্তি) ওরা তো কেউ তুমি নও।
অর্থাৎ তুমি ছাড়া আর সবাইকে উত্যক্ত করা পুরুষের পৌরুষের প্রমাণ দেয় যেন।
প্রেম এবং বিয়ে প্রসঙ্গে রোদেলার নিষ্ক্রিয় অবস্থান আরও বেশি স্পষ্ট। দুজন পুরুষ মিলে নির্ধারণ করে দেয় নারীটি কার। অর্থাৎ নিঝুমের জন্য উদয়ের যে আত্মত্যাগ তা মূলত পৌরুষের জন্য পুরুষের আত্মত্যাগ। নারীটি কেবল তাদের অনুসারী। এমনকি যে নারী একসময় ‘লিভ টুগেদার’ করে হলেও কোর্স শেষ করতে চাইতো, উদয়ের প্রেম প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে সেই নারীই সব ছেড়ে এসে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যায়। যেন নারীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো বিয়ে। বিয়েই তার মুক্তি ঘটাতে পারে। বিদেশে পড়াশোনা করে এসে তার কোন কর্মপরিচয় পাওয়া যায়না।
তবে পরিচালক আখ্যানের শেষ ভাগে এসে রোদেলার একটি নিজস্ব অবস্থান নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। যদিও তা এইডস সচেতনতার আখ্যানের নিচে চাপা পরে যায়। বিয়ের রাতে অপমানিত হয়ে রোদেলা নিজের আত্মসম্মানের জন্য লড়াই করে, আইনি সহায়তা নেয়। তবে পরিচালকের সমাজ সচেতনতার বাণী প্রচারে বিশেষত এইডস সম্পর্কিত বিষয় এবং উদয়ের আইনি লড়াইটি বড় হয়ে ওঠে। এই ছবির সমাপ্তি আশাব্যঞ্জক। রোদেলা দুজন পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করে ‘রোদের আলো’ সংগঠন গড়ে তোলে। নিজের পরিচয় এবং অন্য নারীর সহায়তায় নিজেকে সঁপে দেয়। নির্মাতা এই বিষয়টিকে এত কম সময় জুড়ে রেখেছেন যে এই প্রতীতি জন্ম নিতে নিতে তা বিলীন হয়ে যায়।
একটি বিষয় গভীরভাবে অনুধাবনের। তাহলো মূলধারার যে বাণিজ্যিক ফর্মুলা ভিত্তিক ছবি সেখানে নির্মাতা একজন নারী হয়েও আখ্যানের চিত্রায়নে পরিবর্তন সামান্য। মালভি তার লেখায় বলেছেন, এই প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারাটিই পিতৃতান্ত্রিকতার আখর তাই নারীকে এর বাইরে গিয়ে কাউন্টার সিনেমার কথা ভাবতে হবে।
শেষকথন
চলচ্চিত্র সমাজবাস্তবতার বাইরে কোন কল্পিত জগত নয়। বরং তা বাস্তবতার সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ মাধ্যম। পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো যেখানে বিদ্যমান সেই কাঠামোর মধ্য থেকে নারীর নিজস্বতা পরিস্ফূটিত হতে পারেনা। বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চলচ্চিত্রের বিষয় যখন পাল্টে যায়, তাকে দেখার চোখ যখন পাল্টে যায়, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রকাশভঙ্গিও পাল্টাতে বাধ্য। নারী আর পুরুষের যাপিত জীবন, অনুভব, সংকট ও সমস্যা যখন আলাদা তখন তাদের প্রকাশভঙ্গিও আলাদা হবে। একজন নির্মাতা হিসেবে আমার নিজেরও খোঁজ কী সেই আঙ্গিক, যেখানে আমার বলার স্বাধীনতা পাওয়া যাবে। একটি ভাবনা দিয়ে আলোচনা শেষ করতে চাই, হোক সে মূলধারা কিংবা স্বাধীনধারা, বাংলাদেশের নারী নির্মাতারা প্রচলিত গতানুগতিক কাঠামোতে থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছেন। কেন তারা তাদের নিজস্ব নির্মাণ পথ, নির্মাণ শৈলী অনুসন্ধান করছেননা? হতে পারে সেটা কাউন্টার সিনেমা বা নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা বা নতুন কিছু।
লাবনী আশরাফি
চলচ্চিত্রকার, শিক্ষক ও গবেষক
প্রভাষক, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ
ইমেইল: laboni.ashrafi11@gmail.com
তথ্যসূত্র:
১। আউয়াল, সাজেদুল (২০০৪), শামীম আখতারের চলচ্চিত্রঃ স্মৃতি—বিস্মৃতির পুনঃনির্মাণ, কালি ও কলম, ঢাকা, বৈশাখ, ১৪১১, পৃঃ ১১৭—১২৪
২। গায়েন, ড. কাবেরী (২০১৩), মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নারী নির্মাণ, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা, পৃঃ ৫১
৩। নাসরীন, গীতি আরা, ফাহমিদুল হক (২০০৮), বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প সংকটে জনসংষ্কৃতি, শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা, পৃঃ ১৩৩
৪। রহমান, খান ফেরদৌস, ‘ঢাকাই চলচ্চিত্রে নারী নির্মাণ’, নারী ও প্রগতি পত্রিকা, ষান্মাসিক জার্নাল, পৃঃ ৫২
৫। সুলাতানা, শেখ মাহমুদা (২০০২), ‘ঢাকার চলচ্চিত্রে নারীঃ দানব, দেবতা ও পতির রাজ্যে — এক্সট্রা ও সতী’, নাসরীন, গীতি আরা, মফিজুর রহমান ও সিতারা পারভিন সম্পা. গণমাধ্যম ও জনসমাজ, ঢাকা, শ্রাবণ প্রকাশনী
৬। স্টেঞ্জ, ম্যারি জেস ও ক্যারল কে ওয়েস্টার, এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ওম্যান ইন টুডেস ওয়ার্ল্ড, ভলিউম—১, ২০১১
৭। হক, ফাহমিদুল (২০০৭), ‘চোখের আরাম ও বর্ণনাধর্মী চলচ্চিত্রঃ লরা মালভি’, ৮ম সংখ্যা, যোগাযোগ, ঢাকা, পৃষ্ঠাঃ ১২১
৮। হায়াৎ, অনুপম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ১ম প্রকাশ, মে ২০১১, পৃঃ ১১২